শেষ কারাভেল || অধ্যায় ৮: পুরনো বন্ধু

Image: Ai Generated

সে রাতে লুকাস এলেনাকে কোলে নিয়ে বসিয়ে খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল, "লজেন্সটা কে দিয়েছে, সোনা?"

"একজন লম্বা কাকু," এলেনা মুখে আঙুল দিয়ে ভাবতে ভাবতে বলল। "ধূসর কোট পরা। ফোয়ারার কাছে। খুব ভালো গন্ধ ছিল, দাদা, মিষ্টি মিষ্টি। উনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন, তারপর বললেন, আমার দাদা কেমন আছে।"

লুকাসের হাত শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু সে গলার স্বর স্বাভাবিক রাখল। "তুমি কী বললে?"

"বললাম, দাদা এখন খুব দুঃখী। বাবা চলে গেছে তো।" এলেনা কাঁধ ঝাঁকাল। "কাকু বললেন, দাদাকে বোলো, ওর বন্ধু ওকে মনে রেখেছে।"

সেই মুহূর্তে লুকাসের ইচ্ছে হলো ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে বোনকে বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলে। সে ধীরে ধীরে লজেন্সটা এলেনার হাত থেকে নিল। "এটা আর খেয়ো না, সোনা। অচেনা কারও কাছ থেকে কোনোদিন কিছু নেবে না, ঠিক আছে? কথাও বলবে না। কথা দাও।"

এলেনার ঠোঁট ফুলে উঠল, কিন্তু সে মাথা নাড়ল। মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিলেন। তাঁর চোখে প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের নিচে আরেকটা কিছু, যেটা লুকাস চিনতে পারল না। এলেনা ঘুমিয়ে পড়ার পর মা নিচু গলায় বললেন, "তুই কিছু একটা লুকাচ্ছিস, লুকাস।"

লুকাসের গলা শুকিয়ে গেল। "না, মা। শুধু... সাবধান থাকা ভালো।"

মা অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, "তোর বাবাও ঠিক এভাবেই তাকাত, যখন কিছু বলতে চাইত না।" আর কোনো কথা না বলে তিনি ঘুমোতে চলে গেলেন। লুকাসের মনে হলো, সেই একটা বাক্য তাকে সারা রাত ঘুমোতে দেবে না।

ভোরে সে একা বেরোল। আজ আর বাজারে নয়, বন্দরেও নয়। বাবার চিঠির প্রতিটা সতর্কবাণী মনে রেখেও সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই অন্ধকারে একা হাঁটলে সে ডুবে যাবে, তাকে এমন একজন দরকার যে বাবাকে চিনত। আর এই শহরে সে মানুষটা মাত্র একজনই।

কুয়াশা-মাখা ভোরে শহরের গলিগুলো প্রায় জনশূন্য ছিল। দূরে টিলার ওপর গির্জার চূড়া ধূসর আকাশের গায়ে কালো আঁচড়ের মতো দাঁড়িয়ে, আর নিচের পথে ভেজা পাথরে তার নিজের পায়ের শব্দ বড় বেশি জোরে শোনাচ্ছিল। প্রতিটা মোড়ে সে থেমে চারদিকে তাকাল, খুঁজল ধূসর আলখাল্লা, খুঁজল লবঙ্গের গন্ধ। কিছু নেই। তবু তার মনে হচ্ছিল, শহরের প্রতিটা বন্ধ জানালা তাকে দেখছে।

এস্তেবানের কুঁড়েঘর ছিল শহরের একদম শেষ প্রান্তে, পুরনো দড়ি-পাকানোর কারখানার পেছনে, যেখানে নোনা বাতাসে কাঠের দেয়াল ধূসর হয়ে গেছে আর ছাদের খড় ঝুলে পড়েছে। ঘরের চারপাশে সাজানো ভাঙা দাঁড়, জীর্ণ জাল, আর মরচে ধরা নোঙর। দরজায় টোকা দেওয়ার আগেই ভেতর থেকে ভরাট গলা এল:

"ভেতরে এসো, লুকাস। আমি জানতাম, তুমি আসবে।"

ঘরটা ছোট, অন্ধকার, তামাক আর পুরনো কাঠের গন্ধে ভরা। এস্তেবান জানালার পাশে একটা ভাঙা চেয়ারে বসে ছিল, লাঠিটা কোলের ওপর রাখা। দিনের আলোয় তাকে আরও বুড়ো আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। লুকাস দরজা ভেজিয়ে দিল।

"আমি আপনাকে মিথ্যে বলেছিলাম," সে সরাসরি বলল। "সিন্দুক আমি খুলেছি।"

বুড়ো ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। "আমি জানতাম। তোমার চোখ বলে দিয়েছিল। তুমি তোমার বাবার মতো মিথ্যে বলতে পারো না।"

"তাহলে আপনি কেন আমাকে মিথ্যে বলতে বলেছিলেন? কেন বলেছিলেন, আপনাকেও না?"

এস্তেবান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জানালা দিয়ে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছিল, দূর, ভারী। তারপর সে বলল, "বোসো, ছেলে। অনেক কথা আছে, আর আমার সময় কম।"

লুকাস একটা উল্টানো পিপের ওপর বসল। বুড়ো তার ঘোলাটে চোখ জানালার দিকে ফিরিয়ে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।

"আমি তোমার বাবার সাথে বারো বছর সমুদ্রে ছিলাম। একসাথে ঝড় সামলেছি, একসাথে ক্ষুধার্ত থেকেছি। যখন সে প্রথমবার ওই পথটা আবিষ্কার করল, আমিই ছিলাম সেই ব্যক্তি, যাকে সে সবার আগে বলেছিল। আমরা তিনজন জানতাম। সে, আমি, আর..." সে থেমে গেল। "না, আর একজনের কথা আজ নয়।"

"পথটা কীসের পথ?"

"সেটা তোমার বাবা তোমাকে নিজে বলতে চেয়েছিল। আমি শুধু বলি, ওই পথের ওপারে এমন কিছু আছে, যা পাওয়ার জন্য অনেক মানুষ রক্ত ঝরাতে রাজি।" এস্তেবানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। "দিয়েগো ভয় পেয়েছিল, লুকাস। যাত্রার আগের কয়েক সপ্তাহ সে কারও ওপর ভরসা রাখতে পারছিল না। তার নিজের ক্রুদের ওপরও না। সে আমাকে চাবিটা দিল আর বলল, যদি আমি না ফিরি, এটা শুধু আমার ছেলেকে দিও।"

"আপনি তার সাথে গেলেন না কেন?"

প্রশ্নটা বুড়োর বুকে গিয়ে লাগল। সে হাতের মুঠো শক্ত করল, তারপর এমন একটা স্বর বেরোল, যা লুকাস আগে কখনও শোনেনি। ভাঙা, লজ্জিত।

"সে আমাকে ডেকেছিল। আমি যাইনি। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম, ছেলে। আমি বুড়ো হয়ে গেছি, আর আমার ভেতরে সাহস শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি বলেছিলাম, শরীর খারাপ। দিয়েগো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গিয়েছিল। সে শুধু হেসেছিল, সেই ক্লান্ত হাসি, আর বলেছিল, 'ঠিক আছে, বুড়ো দোস্ত। তুমি তাহলে আমার পরিবারটা দেখো।'" এস্তেবানের চোখ থেকে একফোঁটা জল দাড়ির ভেতরে হারিয়ে গেল। "আর আমি দেখিনি। সে গেল, আর আমি এখানে বসে রইলাম।"

লুকাস চুপ করে রইল। এই প্রথম সে বুঝল, সে একা নয়, যার বুকে সেদিনের অপরাধবোধ পাথর হয়ে বসে আছে। তার ভেতরে বুড়োর প্রতি আর সন্দেহ রইল না, শুধু এক অদ্ভুত সহমর্মিতা।

"তাহলে আপনি আমাকে কেন বললেন, আপনাকেও না?"

"কারণ আমি জানি, ওরা যদি আমাকে ধরে, আমি বেশিক্ষণ টিকব না," বুড়ো সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "যে কথা আমি জানি না, তা আমি কাউকে বলতে পারব না। এটাই তোমাকে বাঁচানোর একমাত্র পথ।"

লুকাসের বুকের ভেতর জমে থাকা একটা গিঁট ধীরে ধীরে খুলে গেল। সে সংক্ষেপে আগন্তুকের কথা বলল, লবঙ্গের গন্ধ, ধূসর আলখাল্লা, এলেনার লজেন্স। এস্তেবানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

"ওই লোকটাকে আমি চিনি না," সে ধীরে বলল। "কিন্তু ওর মতো লোকদের চিনি। এরা সাধারণ চোর নয়। এরা এমন মানুষ, যারা সমুদ্রের পথও কিনে রাখে, আর যে বিক্রি করতে রাজি হয় না, তাকে সরিয়ে দেয়।" সে কাঁপা হাতে লুকাসের কব্জি ধরল। "ছেলে, তোমার বাবার মানচিত্রের ছেঁড়া অংশটা, আমি জানি কেন। দিয়েগো নিজে ওটা ছিঁড়েছিল। বলেছিল, পুরো পথ এক জায়গায় রাখা ঠিক নয়। ছেঁড়া কোণটা আর খাতার শেষ পাতাগুলো সে সাথে নিয়ে গিয়েছিল জাহাজে।"

লুকাসের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। "তার মানে ওগুলো..."

"হয়তো এখনও জাহাজেই কোথাও আছে। আর সেই কারণেই ওরা জাহাজটা পাহারা দিচ্ছে।" এস্তেবান জানালার বাইরে বন্দরের দিকে ইশারা করল, যেখানে দূরে ভাঙা মাস্তুল দেখা যাচ্ছিল। "ওরা খুঁজছে, কিন্তু এখনও পায়নি। পেলে কবেই জাহাজটা ছেড়ে দিত।"

"আর চাবি? দ্বিতীয় কোনো চাবি আছে?"

"না। একটাই চাবি, আর সে চাবি আমি নিজের চোখের মতো আগলে রেখেছিলাম।"

লুকাস দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘরটা ছোট, অথচ হঠাৎ করে তার মনে হলো, সামনে এক বিশাল দরজা খুলে যাচ্ছে।

"আর একটা কথা," এস্তেবান আরও নিচু গলায় বলল, যেন দেয়ালও শুনতে পারে। "তুমি কি জানো, ওই জাহাজটার নাম কী?"

লুকাস থমকে গেল। এতদিন সে শুধু "বাবার জাহাজ" বলে এসেছে। নামটা কেউ কখনও উচ্চারণ করেনি।

"এস্তেলা নেগ্রা," বুড়ো ফিসফিস করল। "কালো তারা।"

লুকাসের চোখের সামনে ভেসে উঠল সিন্দুকের ঢাকনা, মানচিত্রের কোণ, সাত বিন্দুর একটির ওপর আঁকা সেই চিহ্ন। একটা তারা, যার মাঝখান দিয়ে একটা রেখা নেমে গেছে।

"দিয়েগো বলেছিল, আসল জিনিস সিন্দুকে নেই," এস্তেবান ফিসফিস করে শেষ করল। "ওটা জাহাজের ভেতরে লুকোনো।"
Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!