![]() |
| Image: Ai Generated |
সন্ধ্যার আলো কমে আসছিল, আর লুকাস উত্তরের ঘাটের পাথরের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল, চোখ আটকে ছিল ঘাটের শেষ প্রান্তের সেই একলা জাহাজটার ওপর।
এস্তেবানের কুঁড়েঘর থেকে ফেরার পর সারাদিন সে নিজের সাথে লড়েছে। বুড়ো বারবার বলেছিল, অপেক্ষা করো, সময় বুঝে এগোও। কিন্তু প্রতিটা ঘণ্টা মানে ওদের একটা করে বাড়তি সুযোগ। ওরা এক সপ্তাহ ধরে জাহাজটা তন্নতন্ন করে খুঁজছে। যদি আসল জিনিসটা ওরা পেয়ে যায়, তাহলে বাবার সবটুকু রহস্য চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। লুকাস ঠিক করেছিল, আজ রাতেই সে নিজের চোখে দেখবে।
অন্ধকার নামতেই জোয়ার সরে গেল। কালো পানি পিছিয়ে গিয়ে ঘাটের পাশে ভিজে কাদার চওড়া ফালি রেখে গেল, আর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল শ্যাওলা আর পচা শামুকের তীব্র গন্ধ। জাহাজের ডেকে প্রহরী লোকটা কিছুক্ষণ পায়চারি করল, তারপর হাই তুলে মই বেয়ে নামল। একটা লণ্ঠন হাতে নিয়ে সে চলল মূল ঘাটের দিকে, যেখানে সরাইখানার জানালায় হলুদ আলো আর হইহল্লা। লুকাসের মনে পড়ল ফেলিপার কথা: নতুন রুপোর মুদ্রা। এই লোকের পকেটেও নিশ্চয়ই সেই মুদ্রা আছে।
সে অপেক্ষা করল, গুনে গুনে একশো পর্যন্ত। তারপর কাদার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে নেমে গেল।
জাহাজটা কাছ থেকে আরও বিশাল দেখাল। কালো, ভেজা কাঠের দেয়াল তার মাথার ওপর দৈত্যের মতো উঠে গেছে। খোলের গায়ে লম্বা ক্ষতচিহ্নটা এখন স্পষ্ট, কিন্তু অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার, যেন ঝড়ের এলোমেলো আঘাত নয়। লুকাস ঘাটের খুঁটির সাথে বাঁধা মোটা দড়ি ধরে ঝুলে উঠল, হাতের পেশিতে টান পড়ছিল। দু'বার পা পিছলে গেল, একবার প্রায় ছিটকে পড়ছিল কাদায়। তারপর একটা শেষ ঝটকায় সে রেলিং টপকে ডেকে নামল।
নিস্তব্ধতা। শুধু পুরনো কাঠের কাতরানি আর দূরের ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎ।
ডেকের ওপর পা রাখতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি তাকে গ্রাস করল। এই কাঠে তার বাবা হেঁটেছেন, এই দড়ি তাঁর হাতে ঘষেছে, এই বাতাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছেন। লুকাসের গলা ধরে এল। সে ধীরে ধীরে মাস্তুলের দিকে এগিয়ে গেল, যেটা ভাঙা, ঝড়ের শিকার।
কিন্তু ভাঙা অংশটায় হাত রাখতেই তার আঙুল থেমে গেল।
ঝড়ে ভাঙা কাঠ হয় ছিন্নভিন্ন, তন্তু বেরিয়ে থাকা, এবড়োখেবড়ো। অথচ এই মাস্তুলের ভাঙা কিনারাটা প্রায় সোজা, আর তার ওপর সারি সারি সূক্ষ্ম, সমান্তরাল দাগ। করাতের দাগ। কেউ আধখানা কেটে বাকিটা ভেঙে ফেলেছে, যাতে মনে হয় বাজ বা ঝড় এই কাজ করেছে।
সে কাঁপা হাতে পকেট থেকে সেই কাঠের টুকরোটা বের করল, যেটা উত্তরের জেটিতে কুড়িয়ে পেয়েছিল। এই মাস্তুলের কিনারার সাথে মিলিয়ে দেখল। না, ওটা বাক্সের কাঠ। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হলো। এই জাহাজে যা হয়েছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়, সাজানো নাটক।
পেছনের দিকে, বাবার কেবিনের দরজাটা আধখোলা। দরজার ওপর খোদাই করা একটা তারা, মাঝখানে রেখাটানা, সিন্দুকের ঢাকনার সেই চিহ্ন। লুকাসের হৃৎপিণ্ড ধক ধক করে লাফিয়ে উঠল। সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরটা দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। কেবিনটা লণ্ডভণ্ড। বিছানার গদি ফালা ফালা করে ছেঁড়া, ভেতরের খড় ছড়িয়ে আছে মেঝেতে। দেয়ালের তাক ভাঙা, বাক্স উপুড়, মেঝের তক্তা জায়গায় জায়গায় তুলে ফেলা। কেউ একজন প্রতিটা ইঞ্চি খুঁজে দেখেছে, নির্দয়ভাবে, বারবার। বাবার সবকিছু, বই, যন্ত্র, জামা, সব টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে।
লুকাসের গলার ভেতরটা জ্বলে উঠল। রাগ আর অসহায়তা একসাথে। সে হাঁটু গেড়ে বসে মেঝে থেকে একটা ছেঁড়া বইয়ের পাতা তুলে নিল। বাবার হাতের লেখা। ধুলো আর কাদা মাখানো পায়ের ছাপ তার ওপর। এই লেখা সে সারা জীবন দেখেছে, তাঁর ডায়েরিতে, চিঠিতে, মাকে লেখা ছোট ছোট চিরকুটে। আজ সেটা কাদার নিচে চাপা পড়ে আছে, বুটের তলায় থেঁতলানো। লুকাস পাতাটা সযত্নে ঝেড়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
তারপর, ঘরের কোণে, লণ্ঠন ঝোলানোর ছোট পিতলের আংটাটার দিকে তার চোখ গেল।
আংটা থেকে একটা ছোট্ট কালো পুঁটলি ঝুলছিল, তেলকাপড়ে মোড়া, আকারে মুঠোর চেয়েও ছোট। দেখে মনে হয় কারো ফেলে রাখা ন্যাকড়া। আর ঠিক এই কারণেই, লুকাস ভাবল, খোঁজকারীরা এটা ছোঁয়নি। কিন্তু তার চোখ আটকে গেল পুঁটলির মুখের গিঁটে।
গিঁটটা জটিল, পাকানো, নাবিকদের এক বিশেষ গিঁট। লুকাস এই গিঁট চেনে, কারণ সে ছোটবেলা এটাই শিখেছিল, একমাত্র বাবার কাছে। কেউ জানে না, কেউ এটা খোলার পথ জানে না, শুধু তারা দুজন।
তার হাত কাঁপতে শুরু করল। সে পুঁটলিটা আংটা থেকে খুলে নিয়ে জামার ভেতরে গুঁজে রাখল, ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে ঝুলছে পিতলের চাবি।
ঠিক তখনই কেবিনের বাইরে ডেকে ভারী বুটের শব্দ হলো।
লুকাসের রক্ত জমে গেল। একটা নয়, দুটো পায়ের শব্দ। কথা বলছে, নিচু গলায়, আর এগিয়ে আসছে কেবিনের দিকে। আলো নেভানোর কোনো উপায় নেই, লুকানোর সময় নেই। সে ছুটে গিয়ে দেয়ালের ভাঙা তাকের পেছনে, অন্ধকারে সেঁধিয়ে গেল, শ্বাস বন্ধ করে।
দরজা খুলে গেল। লণ্ঠনের আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আর তার সাথে বাতাসে ভেসে এল একটা পরিচিত, মিষ্টি গন্ধ।
লবঙ্গ।
"এক সপ্তাহ, ওলিভেরা," একটা নরম গলা বলল। সেই বিদেশি টান, সেই শান্ত, ঠান্ডা সুর। "এক সপ্তাহে তুমি তক্তা তুলেছ, গদি ছিঁড়েছ, দেয়াল ভেঙেছ। আর কিছুই পাওনি, ওলিভেরা।"
আরেকটা গলা, ভারী, ঘামে-ভেজা, ভীত। লুকাস এই কণ্ঠ চেনে। সেই মোটাসোটা, ক্লান্ত ক্যাপ্টেন। "আমি... আমি সবকিছু উল্টে দিয়েছি, স্যার। যদি কিছু থাকত..."
"ছেলেটা সিন্দুক খুলেছে," আগন্তুক হালকা গলায় বলল। "আজ সকালে সে বুড়ো এস্তেবানের সাথে দেখা করেছে। দিয়েগো যা-ই রেখে গিয়ে থাকুক, সে এখন জানে ওটা এই জাহাজে আছে।"
"তাহলে আমরা তাকে..."
"না।" শব্দটা ছোট, কিন্তু তাতে এমন এক ঠান্ডা কর্তৃত্ব ছিল, যে ক্যাপ্টেন চুপ হয়ে গেল। "তাকে ছোঁবে না। ওকে খেলতে দাও। ও যা খুঁজবে, আমরা তা পাব। ছেলেটা নিজেই আমাদের পথ দেখাবে। আমাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে, আর চোখ খোলা রাখতে হবে।"
ভাঙা তাকের পেছনে লুকাস নিঃশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছিল। বুকের ভেতর পুঁটলিটা, আর পিতলের চাবি, দুটোই যেন গরম হয়ে উঠেছে।
"আর যদি সে নিজেই পেয়ে যায়?" ওলিভেরা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।
আগন্তুকের হাসির শব্দ শোনা গেল, ছোট্ট, সৌজন্যপূর্ণ।
"তাহলে তো আরও ভালো। তখন সে নিজেই আমাদের হাতে তুলে দেবে। শুধু সময়টা আমরা ঠিক করব।"
লণ্ঠনের আলো নড়ে উঠল। পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দরজার দিকে ফিরে গেল। দরজা বন্ধ হলো। অনেকক্ষণ পরে, যখন ডেকের শব্দও মিলিয়ে গেল, লুকাস টলতে টলতে বেরিয়ে এল। তার সারা শরীর ঘামে ভেজা, হাঁটু কাঁপছে।
ওরা তাকে পথ দেখাতে দিচ্ছে। ওদের ধারণা, লুকাস কিছুই খুঁজে পায়নি।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিঃশব্দে ডেক পেরিয়ে দড়ি বেয়ে নেমে এল কাদার ওপর, আর পা টিপে টিপে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মূল ঘাটের দিকে থেকে প্রহরীর মাতাল গানের কলি ভেসে আসছিল, জোয়ার ফিরতে শুরু করেছে, আর ঢেউগুলো ধীরে ধীরে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ছিল, যেন কিছুই ঘটেনি। সারা পথ লুকাসের মনে হচ্ছিল, প্রতিটা ছায়ার ভেতর থেকে একজোড়া ধূসর চোখ তাকে দেখছে।
আর তার জামার নিচে, বুকের ওপর, বাবার পুঁটলিটা তখনও ধুকপুক করছিল।
