শেষ কারাভেল || অধ্যায় ২: শেষকৃত্য ও শূন্যতা

 

শেষ কারাভেল || অধ্যায় ২: শেষকৃত্য ও শূন্যতা
Image: Ai Generated



তৃতীয় দিনের সকালে আকাশটা ছিল ধূসর আর ভারী, যেন কেউ পুরো পোর্তো ভেলিয়োর ওপর একটা ভেজা কম্বল চাপিয়ে দিয়েছে। সমুদ্র থেকে ঠান্ডা হাওয়া উঠে আসছিল, আর সেই হাওয়ায় কালো পোশাকের মানুষগুলোর কাপড় ফুলে উঠছিল ছেঁড়া পালের মতো। গলির পাথরে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে আকাশের ছায়া কাঁপছিল, আর সেই কাঁপুনির ওপর দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিল শোকযাত্রা।




টিলার পথে ওঠা সহজ ছিল না। ভেজা পাথরের সিঁড়ি পিছল হয়ে ছিল, আর প্রতিটা ধাপে মানুষের জুতোর শব্দ মিশে যাচ্ছিল দূরের ঢেউয়ের গর্জনে। মায়ের মাথায় কালো শাল, তাঁর মুখ পাথরের মতো স্থির, শুধু ঠোঁট দুটো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। এলেনার ছোট জুতোজোড়া কাদায় ভিজে গিয়েছিল, তবু সে একবারও অভিযোগ করেনি।



শহরের পশ্চিম প্রান্তে, খাড়া পাথুরে টিলার মাথায়, দাঁড়িয়ে ছিল নোনা-ধরা পাথরের একটা ছোট গির্জা। সবাই তাকে নাবিকদের গির্জা বলে ডাকত। যাদের শরীর সমুদ্র ফেরত দেয়নি, তাদের স্মরণসভা হতো এখানেই। ভেতরের দেয়ালজুড়ে খোদাই করা শত শত নাম, আর প্রতিটা নামের পেছনে একটা করে জাহাজ, একটা করে ফিরে-না-আসা রাত। আজ সেই দেয়ালে আরেকটা নাম উঠবে: দিয়েগো মোরেনো।



গির্জার মাঝখানে রাখা ছিল একটা খালি কফিন। ভেতরে কোনো শরীর নেই, শুধু দিয়েগোর পুরনো নীল কোটটা ভাঁজ করা। কোটটা মা নিজের হাতে বের করে এনেছিলেন আলমারি থেকে, সেই কোট, যেটা তিনি এই ক'দিন বারবার হাতে নিয়ে আবার রেখে দিয়েছিলেন। আজ সকালে তিনি আর রাখেননি। কোটের পকেটে বাবার একটা পুরনো কম্পাস ছিল, মা সেটাও রেখে দিলেন ভাঁজের ওপর। তারপর কফিনের ঢাকনা নামিয়ে দিলেন, খুব আস্তে, যেন ভেতরে কেউ ঘুমিয়ে আছে।



লুকাস সামনের সারিতে বসে ছিল, কিন্তু পাদ্রির কথাগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছিল না। শব্দগুলো ঘরের ছাদে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল, অর্থহীন, ফাঁপা। তার ডান পাশে ছোট এলেনা মায়ের হাত ধরে বসে ছিল, পা দুটো বেঞ্চ থেকে ঝুলছে, মাটি ছুঁতে পারছে না। হঠাৎ সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, বাবা কি ওপর থেকে আমাদের দেখতে পাচ্ছে?"



লুকাস উত্তর দিতে পারল না। গলায় কিছু একটা আটকে গেছে, যেন একটা পাথর। আর ঠিক তখনই স্মৃতিটা ফিরে এল, সেই স্মৃতি, যেটা গত তিন দিন ধরে সে ইচ্ছে করে এড়িয়ে চলছিল।



বাবার শেষ যাত্রার আগের রাত। রান্নাঘরের টেবিলে মোমের আলোয় বসে ছিলেন দিয়েগো, সামনে ভাঁজ করা কিছু কাগজ। তিনি বলেছিলেন, "এবার আমার সাথে চলো, লুকাস। তোমাকে কিছু দেখাতে চাই। এমন কিছু, যা কোনো বইয়ে নেই।"



লুকাস তখন ক্লান্ত ছিল। উপকূলের ছোট মালবাহী নৌকায় সারাদিন খেটে ফিরেছে, হাত ফেটে গেছে নোনা পানিতে। সে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, "আমি আর তোমার ওই দিগন্তের পেছনে ছুটতে পারব না, বাবা। প্রতিবার তুমি বলো এবার কিছু একটা পাবে। প্রতিবার খালি হাতে ফেরো।"
দিয়েগো কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর হেসেছিলেন, সেই ক্লান্ত, নরম হাসি। "ঠিক আছে। ফিরে এসে বলব।"
ফিরে এসে বলব।



এই চারটা শব্দ এখন লুকাসের বুকের ভেতর পেরেকের মতো গেঁথে ছিল। বাবা ফিরে আসেননি। আর যা বলার ছিল, তা বলা হয়নি, শোনাও হয়নি। অথচ বাবার হাত দুটো সে স্পষ্ট মনে করতে পারে: দড়ির ঘষায় খসখসে, নোনা পানিতে ফাটা, তবু ছোটবেলায় যখন সে ঘুমোতে পারত না, ওই হাত দুটোই তার কপালে আলতো করে চাপড় দিত। সেই রাতে সে বাবার চোখের দিকে একবারও ভালো করে তাকায়নি। শেষ কথাটা ছিল রাগের, অভিমানের, অবিশ্বাসের।



আমি যদি সাথে যেতাম... আমি যদি সেদিন না বলতাম...
প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরছিল ঘূর্ণির মতো, আর প্রতিবার ঘুরে এসে তাকে আরও গভীরে টেনে নিচ্ছিল।



স্মরণসভা শেষ হলো। একে একে মানুষ এসে মাকে জড়িয়ে ধরল, লুকাসের কাঁধে হাত রাখল, কেউ কেউ কিছু বলার চেষ্টা করল, আবার কেউ শুধু মাথা নেড়ে সরে গেল। বন্ধু তোমাস এসে কিছু না বলে লুকাসকে জড়িয়ে ধরল, অনেকক্ষণ। তার কোটে ভেজা মাটির গন্ধ। "ঠিক আছিস?" অবশেষে সে জিজ্ঞেস করল। "না," লুকাস বলল, আর এই প্রথম কথাটা উচ্চারণ করে সে অনুভব করল, মিথ্যে বলার শক্তিটুকুও তার আর নেই।



লুকাসের চোখ গির্জার পেছনের দরজায় আটকে গেল। সেই মোটাসোটা, ক্লান্ত ক্যাপ্টেন, যে বাবার জাহাজ ফিরিয়ে এনেছিল, দাঁড়িয়ে ছিল একেবারে শেষ সারিতে, টুপি হাতে। সে কারো সাথে কথা বলেনি, মায়ের কাছেও আসেনি। লুকাস তার দিকে এগোতে যেতেই লোকটা মাথা নামিয়ে নিল আর দরজা দিয়ে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল, ঠিক সেই তরুণ নাবিকটার মতো, যে তিন দিন আগে লুকাসের চোখ এড়িয়ে পালিয়েছিল।



একজন মানুষ নিজের ক্যাপ্টেনের স্মরণসভায় এসে কেন পালিয়ে যায়?



প্রশ্নটা ছোট, কিন্তু তার ভেতরে ঢুকলে অন্ধকার সুড়ঙ্গ। লোকটা যদি সত্যিই শোকার্ত হতো, সে মায়ের হাত ধরে দুটো কথা বলত। যদি অপরাধী না হতো, সে লুকাসের চোখ থেকে পালাত না। শোক আর অপরাধবোধ দুটোই মানুষকে নীরব করে দেয়, লুকাস সেটা নিজের জীবনেই এই তিন দিনে বুঝে গেছে। কিন্তু এই নীরবতার রং অন্যরকম লাগল তার কাছে।
ধীরে ধীরে গির্জা ফাঁকা হয়ে এল। মা এলেনাকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন, আর লুকাস বলল সে একটু পরে আসছে। সে হেঁটে গেল টিলার কিনারায়, যেখানে পাথুরে মাটি হঠাৎ শেষ হয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমুদ্রের দিকে।



নিচে সাগর গর্জে উঠছিল। বিশাল ঢেউগুলো একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছিল কালো পাথরের গায়ে, সাদা ফেনা ছিটকে উঠছিল আকাশের দিকে, তারপর আবার ফিরে যাচ্ছিল গভীরে। দূরে দিগন্তের কাছে মেঘ আর পানি মিশে এক হয়ে গেছে, কোথায় আকাশ শেষ আর কোথায় সমুদ্র শুরু, বোঝার উপায় নেই। হাওয়ায় নোনা পানির কণা ভেসে এসে লুকাসের মুখে লাগছিল, ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ।



"বাবা," সে ফিসফিস করে বলল, কেউ শোনার জন্য নয়, শুধু নিজের জন্য। "আমি দুঃখিত।"
"তুমি কিছুতেই দোষী নও, ছেলে।"



লুকাস চমকে ঘুরে তাকাল। বুড়ো নাবিক এস্তেবান তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, লাঠিতে ভর দিয়ে, সাদা দাড়ি হাওয়ায় এলোমেলো। তার চোখে এমন কিছু ছিল, যা লুকাস এর আগে দেখেনি। শুধু সমবেদনা নয়, আরও কিছু। ভয়, সম্ভবত আর সংকল্প।



এস্তেবান ধীরে ধীরে কাছে এল। চারদিকে একবার তাকাল, যেন দেখে নিচ্ছে কেউ শুনছে কিনা। তারপর কাঁপা হাতে কোটের ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে লুকাসের হাতের তালুতে চেপে দিল। একটা ছোট পিতলের চাবি। সবুজ জং ধরা, ভারী, বহু পুরনো।



"দিয়েগো আমাকে এটা দিয়ে গিয়েছিল যাত্রার ঠিক আগে," এস্তেবান নিচু গলায় বলল। "বলেছিল, যদি সে না ফেরে, এটা যেন শুধু তোমাকে দিই। আর কাউকে নয়। তোমার মাকেও না।"



লুকাসের হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। "এটা কিসের চাবি?"



"সেই সিন্দুকের, যেটা তোমার বাবা জীবনেও কাউকে খুলতে দেয়নি।" এস্তেবান আরও কাছে ঝুঁকে এল, তার নিঃশ্বাসে পুরনো তামাকের গন্ধ। "আর লুকাস, শোনো। সিন্দুক খোলার আগে নিশ্চিত হয়ো, কেউ তোমাকে দেখছে না।"
কথাটা শেষ হতেই লুকাসের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে চাবিটা মুঠো করে ধরে পেছনে ফিরে তাকাল।



গির্জার দরজার ছায়ায় একটা কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে ছিল, নিশ্চল, টিলার ঢালের দিকে মুখ করা। দূর থেকে মুখ দেখা যাচ্ছিল না। শুধু বোঝা যাচ্ছিল, সে কোনো শোকার্ত মানুষ নয়, সে তাকিয়ে আছে সরাসরি লুকাসের মুঠোর দিকে।
লুকাস এক পলক চোখ ফেলল। পরের মুহূর্তে দরজা শূন্য।
হাওয়া আরও তীব্র হলো। মুঠোর ভেতর পিতলের চাবিটা ঠান্ডা, ভারী, আর আশ্চর্যভাবে জীবন্ত মনে হচ্ছিল, যেন বাবার হৃৎস্পন্দন এখনও তার ভেতরে কোথাও লুকিয়ে আছে। লুকাস বুঝতে পারল, শোক করার সময় শেষ। কেউ একজন জানে, সে কী পেয়েছে।

Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!