![]() |
| প্রতীকী ছবি: AI Generated |
বাতাস থেকে খাবার — শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো লাগলেও এটা সত্যি
কল্পনা করুন তো, শুধু বাতাস আর বিদ্যুৎ দিয়ে প্রোটিন বানানো যাচ্ছে। না এতে কোনো ক্ষেত লাগছে, না লাগছে পানি সেচ আর না লাগছে গরু-ছাগল পালা।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ফিনল্যান্ডের একটা কোম্পানি আর যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটা কোম্পানি এটা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে কাজ করছে, আর এখন তাদের প্রোডাক্ট বাজারেও আসতে শুরু করেছে।
চলুন পুরো ব্যাপারটা সহজ ভাষায় বোঝা যাক। আসলে কী দিয়ে তৈরি হয় এই "বাতাসের প্রোটিন"। ফিনল্যান্ডের কোম্পানি Solar Foods তাদের প্রোটিনের নাম দিয়েছে Solein।
সোলার ফুডসের নিজস্ব বর্ণনা অনুযায়ী, সোলেইন তৈরি হয় বাতাস আর বিদ্যুতের সাহায্যে প্রাকৃতিক, নন-জিএমও এক ধরনের এককোষী জীব থেকে গাঁজন (fermentation) প্রক্রিয়ায়।
সহজ করে বললে, বিশেষ ধরনের মাইক্রোব বা অণুজীবকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন খাওয়ানো হয়, আর সেগুলো রিনিউয়েবল এনার্জি ব্যবহার করে সেই গ্যাস থেকে প্রোটিন তৈরি করে।
এরপর সেই তরল প্রোটিনকে শুকিয়ে গুঁড়ো বানানো হয়, যেটার রং হালকা হলুদ বা সরিষা রঙের।
পুষ্টিগুণে কেমন এই প্রোটিন
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এই পাউডারে প্রায় ৭৮% প্রোটিন, ৬% ফ্যাট এবং ১০% ডায়েটারি ফাইবার থাকে, যেটার পুষ্টি প্রোফাইল শুকনো সয়া বা শৈবালের কাছাকাছি।
এতে নাকি নয়টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিডই আছে, কোলেস্টেরল নেই এবং এর ফ্যাটের বেশিরভাগই আনস্যাচুরেটেড, সাথে আয়রন-ভিটামিন বি১২ ভরপুর।
সোলার ফুডসের নিজস্ব ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে সোলেইনের জন্য "সেলফ-অ্যাফার্মড GRAS" (self-affirmed Generally Recognized As Safe) স্ট্যাটাস পেয়েছে, যেটার ভিত্তি ছিল পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত সেফটি গবেষণা আর একটা স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মূল্যায়ন। এটা মনে রাখা জরুরি, এটা FDA-এর সরাসরি অনুমোদন না — যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মে এই পথে কোম্পানি নিজেই স্বতন্ত্র মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাজারে আসতে পারে। এর বাইরে সোলার ফুডস আলাদাভাবে FDA-এর "নো কোয়েশ্চনস" লেটার পাওয়ার জন্য একটা নোটিফিকেশনও জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে, যেটার সিদ্ধান্ত ২০২৬ সালের মধ্যে আসতে পারে বলে কোম্পানি জানিয়েছে।
এই প্রযুক্তি কতটা বাস্তব?
এখানেই আসল প্রশ্ন — এটা কি সত্যিই বাজারে চলে এসেছে, নাকি এখনো মূলত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ?
সত্যিটা হলো, এটা বাজারে এসেছে ঠিকই — সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে — তবে এর বাণিজ্যিক বিস্তার এখনো অনেকটাই সীমিত।
সিঙ্গাপুরে প্রথম অনুমোদন
একটা রিপোর্ট অনুযায়ী, সোলেইন ২০২২ সালে সিঙ্গাপুর ফুড এজেন্সি (SFA) থেকে প্রথমবারের মতো নভেল ফুড হিসেবে অনুমোদন পায়, যা বাতাস আর বিদ্যুৎ থেকে তৈরি কোনো প্রোটিনের জন্য বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক খাদ্য অনুমোদন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর যুক্তরাজ্যে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান বলে জানা গেছে, এবং একটি সূত্র অনুযায়ী এর জন্য ২০২৬ সালের মধ্যে অনুমোদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে আসা শুরু হয়েছে?
সোলার ফুডসের নিজস্ব ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সোলেইনের বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রথম শুরু হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে, নিউ ইয়র্কের Olmsted রেস্তোরাঁয় একটা বিশেষ মেনুর মাধ্যমে।
তবে সেটা ছিল রেস্তোরাঁ-ভিত্তিক সীমিত ব্যবহার। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সোলেইনের প্রথম প্যাকেজড কনজিউমার প্রোডাক্ট হিসেবে বাজারে আসে Ambrosia Collective নামের একটা কোম্পানির সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে, যাদের Planta ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম প্লান্ট প্রোটিন পাউডারে সোলেইন ব্যবহার হচ্ছে (এর আগে সিঙ্গাপুরে ফিনল্যান্ডের Fazer আর জাপানের Ajinomoto-র মাধ্যমে কনজিউমার প্রোডাক্টে সোলেইন ব্যবহারের কথা জানা গেছে)।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুতে এটা টেস্ট মার্কেটিং হিসেবে সীমিত পরিসরে বাজারে আসছে, আর কোম্পানিগুলো গ্রীষ্মের মধ্যে দেশব্যাপী রোলআউটের পরিকল্পনা করছে বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া আরেকটা রিপোর্ট বলছে, Fermenta নামের একটা কোম্পানি তাদের Gutsy ব্র্যান্ডের অধীনে সোলেইন দিয়ে তৈরি গ্লুটেন-ফ্রি প্রোটিন বার বাজারে আনার পরিকল্পনা জানিয়েছিল ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের জন্য।
তবে খেয়াল রাখা দরকার, এগুলো এখনো মূলত সীমিত-সংস্করণ (limited edition) বা ট্রায়াল পণ্য, বিশাল স্কেলে সবার হাতে হাতে পাওয়া যাচ্ছে না।
কারখানায় উৎপাদন কতটা এগিয়েছে
সোলার ফুডসের বর্তমান ডেমো প্লান্ট, যেটার নাম Factory 01, সেটার একটা রিপোর্ট অনুযায়ী বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৬০ টন, যেটা ২০২৬ সালের মধ্যে ২৩০ টনে বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই একই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোম্পানির পরিকল্পনা করা বড় কারখানা, যার নাম Factory 02, সেটা ধাপে ধাপে তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে — প্রথম ধাপে ২০২৮ সালের মধ্যে বার্ষিক ৩,২০০ টন, দ্বিতীয় ধাপে ২০২৯ সালের মধ্যে ৬,৪০০ টন, আর তৃতীয় ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণ ক্ষমতা ১২,৮০০ টনে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
এই কারখানার জন্য চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি, তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে কোম্পানিটি ফিনল্যান্ডের Business Finland থেকে নির্মাণ ও কমিশনিং-এর জন্য প্রায় ৭৭.৮ মিলিয়ন ইউরোর অনুদান ও ঋণ পেয়েছে বলে কোম্পানি নিজেই জানিয়েছে।
আরেকটা সূত্র অনুযায়ী, Factory 01 এখন প্রতি ঘণ্টায় প্রতি লিটারে ১ গ্রাম হারে উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে, যা কোম্পানির দাবি অনুযায়ী প্রমাণ করে যে বাতাস-ভিত্তিক প্রোটিন উৎপাদন আর শুধু তত্ত্ব নয়, বরং বাস্তবে চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটা কোম্পানি — Air Protein
শুধু সোলার ফুডস নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক Air Protein নামের আরেকটা কোম্পানিও একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
তথ্য অনুযায়ী, এই কোম্পানি ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মাংসের বিকল্প প্রোটিন তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যেখানে তাদের নিজস্ব "AirFermentation" প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে।
একটা প্রতিবেদনে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা লিসা ডাইসন জানিয়েছিলেন, এই প্রোটিন প্রায় ৮০% প্রোটিনসমৃদ্ধ, এবং কোম্পানি মূলত এর উচ্চ প্রোটিন মাত্রা আর টেকসইতার দিকটাই প্রচারে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে Air Protein এখনো বড় পরিসরে ভোক্তা পণ্য বাজারে আনেনি বলেই মনে হচ্ছে, সোলার ফুডসের তুলনায় তাদের বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়া কিছুটা পিছিয়ে আছে বলে ধারণা করা যায়।
কেন এই প্রযুক্তি নিয়ে এত আলোচনা
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়া।
একটা রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রচলিত মাংস উৎপাদনের তুলনায় সোলেইন উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ মাত্র ১% এর মতো হতে পারে, আর উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের তুলনায় প্রায় ২০% এর মতো, যদিও এই সংখ্যাগুলো কোম্পানির নিজস্ব দাবি হিসেবে দেখা উচিত।
কৃষিজমি, সেচের পানি বা সার-কীটনাশক ছাড়াই প্রোটিন তৈরি হওয়ার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন আর খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় এই ধরনের প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এটা মনে রাখা জরুরি, পুরো প্রক্রিয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণ রিনিউয়েবল বিদ্যুৎ দরকার হয়, তাই বিদ্যুতের উৎস আর খরচ এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
এখন প্রশ্ন হলো — এটা কি আমাদের প্লেটে আসবে?
স্বল্প মেয়াদে এই প্রোটিন সরাসরি ভাত-তরকারির মতো "সম্পূর্ণ খাবার" হয়ে আসছে না।
বরং এটা এখন আসছে প্রোটিন পাউডার, প্রোটিন বার, পানীয়র মতো প্রোডাক্ট আকারে, আর রেস্তোরাঁর মেনুতে পাস্তা, ক্রেপ বা ডেজার্টের মতো নানা পদেও এটা ব্যবহার হচ্ছে বলে জানা গেছে — অর্থাৎ এটা মূলত প্রচলিত মাংস বা উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের একটা বিকল্প উপাদান বা ইনগ্রেডিয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে, সরাসরি একটা "সম্পূর্ণ খাবার" হিসেবে না।
দামের দিক থেকেও এটা এখনো সাধারণ প্রোটিনের তুলনায় ব্যয়বহুল, আর উৎপাদন ক্ষমতাও এখনো সীমিত।
তাই বলা যায়, "বাতাস থেকে খাবার" পুরোপুরি বাস্তব প্রযুক্তি, কিন্তু এটা এখনো বাণিজ্যিক বিস্তারের প্রাথমিক ধাপে আছে, রাতারাতি বিশ্বের খাদ্য সংকট সমাধান করে ফেলার মতো অবস্থায় এখনো পৌঁছায়নি।
বাতাস থেকে প্রোটিন তৈরির প্রযুক্তি বিজ্ঞানের একটা চমৎকার অর্জন, আর এটা এখন গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে বাজারেও পা রাখছে।
তবে এটাকে এখনই "খাদ্য সংকটের সমাধান" বলে ধরে নেওয়ার সময় হয়নি, বরং এটাকে একটা সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকের পদক্ষেপ হিসেবে দেখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।
আগামী কয়েক বছরে উৎপাদন যত বাড়বে, দাম যত কমবে, ততই বোঝা যাবে এই প্রযুক্তি সত্যিই আমাদের খাদ্যব্যবস্থা কতটা বদলে দিতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাতাস থেকে তৈরি প্রোটিন খেতে কি নিরাপদ?
উত্তর: সোলেইন নামের প্রোটিনটি ২০২২ সালে সিঙ্গাপুর ফুড এজেন্সি থেকে নভেল ফুড হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গেছে। সোলার ফুডসের নিজস্ব ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এটি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পিয়ার-রিভিউড গবেষণা ও এক্সপার্ট প্যানেলের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সেলফ-অ্যাফার্মড GRAS স্ট্যাটাস পেয়েছে, যা FDA-এর সরাসরি অনুমোদন থেকে আলাদা। ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলে অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
প্রশ্ন ২: এই প্রোটিন কি বাংলাদেশে পাওয়া যাবে?
উত্তর: বর্তমানে এই প্রোটিন মূলত সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত পরিসরে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে এটি কবে আসবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন ৩: এটা কি ল্যাবে তৈরি বা জিএমও খাবার?
উত্তর: কোম্পানির দাবি অনুযায়ী, এটি একটি প্রাকৃতিক ও নন-জিএমও এককোষী জীব থেকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়, কৃত্রিমভাবে জিনগত পরিবর্তন করা কোনো জীব থেকে নয়।
সোর্স:
১. Solar Foods (solarfoods.com, investors.solarfoods.com) — যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে প্রবেশ, GRAS স্ট্যাটাস ও Factory 02 সংক্রান্ত কোম্পানির নিজস্ব অফিসিয়াল ঘোষণা (প্রাইমারি সোর্স)
২. Green Queen (greenqueen.com.hk) — সোলার ফুডসের যুক্তরাষ্ট্র বাজার প্রবেশ ও ফ্যাক্টরি সংক্রান্ত প্রতিবেদন
৩. Food Engineering (foodengineeringmag.com) — Factory 02-এর ধাপে ধাপে ক্যাপাসিটি সংক্রান্ত প্রতিবেদন
৪. Quality Assurance & Food Safety (qualityassuremag.com) — Ambrosia Collective ও সোলেইন পাউডার লঞ্চ সংক্রান্ত প্রতিবেদন
৫. PricePlow (blog.priceplow.com) — সোলেইনের পুষ্টিগুণ ও সিঙ্গাপুর অনুমোদন সংক্রান্ত তথ্য
৬. Intelligent Living (intelligentliving.co) — ফ্যাক্টরি উৎপাদন হালনাগাদ তথ্য (সেকেন্ডারি সোর্স)
৭. SynBioBeta ও Food Dive — Air Protein সংক্রান্ত তথ্য
