![]() |
| প্রতীকী ছবি: AI Generated |
ধরুন, আপনি একটা পুরনো, দুষ্প্রাপ্য বই কিনছেন অনলাইন থেকে। বইটা হয়তো কারো দাদার আমলের সংগ্রহ থেকে এসেছে, আর পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। বিক্রেতা খেয়াল করলেন, একজন রহস্যময় ক্রেতা একসাথে হাজারখানেক বই অর্ডার করে বসে আছেন, পরিচয় পুরোপুরি গোপন রেখে। সন্দেহ হলো তাঁর – বইগুলো যাচ্ছে কোথায়? কার কাছে? কী কাজে?
সন্দেহ দূর করতে বিক্রেতা একটা বুদ্ধি খাটালেন। বইয়ের পাতার ভেতরে লুকিয়ে দিলেন একটা ছোট্ট ট্র্যাকিং ডিভাইস (Apple AirTag)। তারপর অপেক্ষা।
সেই ট্র্যাকার শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিল আমেরিকার নেভাডা রাজ্যের লাস ভেগাসে, অ্যামাজনের এক বিশাল গুদামে। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে এলো এমন এক কাহিনি, যা নিয়ে এখন গোটা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে - বই কেটে তৈরি হচ্ছে AI-এর ট্রেনিং ডেটা।
গুদামের ভেতরে আসলে কী হচ্ছে
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠান 404 Media-র রিপোর্ট বলছে, লাস ভেগাসের ওই গুদামের নাম VGT3। এখানে কর্মরত কয়েকজন কর্মী নিজেরাই জানিয়েছেন, তাঁদের কাজ একেবারেই যান্ত্রিক আর নির্দিষ্ট:
বাল্কে (স্তূপাকারে) বই আসে গুদামে – বাক্সে, কখনো বিশাল কার্ডবোর্ড কনটেইনারে। একটা মেশিনে বই ঢুকিয়ে দিলে ব্লেড নেমে এসে কেটে ফেলে বইয়ের বাঁধাই বা স্পাইন।
বাঁধাইহীন আলগা পাতাগুলো হাইস্পিড স্ক্যানারে দ্রুত স্ক্যান করা হয়। স্ক্যান শেষ হওয়া পাতাগুলো ফেলে দেওয়া হয় বড় বড় খোলা কার্ডবোর্ড বাক্সে (একে অ্যামাজনের ভাষায় বলে "শাটল")।
এখানেই আসল সমস্যা। একবার পাতা আলাদা হয়ে বাক্সে মিশে গেলে, বইটা আর কখনো জোড়া লাগানো সম্ভব না। মানে যে বইটা হয়তো বিরল, হয়তো এক কপিই অবশিষ্ট ছিল পৃথিবীতে – সেটা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কর্মীরা এমনও বলেছেন, একেকটা ফ্লোরে একসাথে ২০ থেকে ২৫টা স্ক্যানার চলে। বইয়ের ভাষাও নাকি বিচিত্র – জার্মান, রুশ, জাপানি থেকে শুরু করে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহের বইও পাওয়া গেছে এই স্তূপে। মজার (এবং কিছুটা অস্বস্তিকর) তথ্য হলো, এই টিমের লোগোতে আছে একটা ডাইনোসর, যার মুখে দাঁত বের করা আর থাবায় ধরা একটা বই।
অ্যামাজন কী বলছে
সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে অ্যামাজনের বক্তব্য মোটামুটি এরকম – তারা বাণিজ্যিক উপায়ে বই কিনে থাকে, যাতে গ্রাহকদের জন্য তাদের প্রোডাক্ট আর সেবা আরও ভালো করা যায়। খুবই সাধারণ, নিরাপদ একটা বিবৃতি – কিন্তু এতে বইগুলো ঠিক কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে, বা কেন সেগুলো এভাবে ধ্বংস করতে হচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
একটা বিষয় সততার সাথে বলে রাখা দরকার – ফ্যাক্ট-চেকিং সাইট Snopes-এর পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, এটা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয় যে অ্যামাজন ইচ্ছাকৃতভাবে শুধু বিরল বই-ই খুঁজছে, নাকি বাল্ক অর্ডারের মধ্যে বিরল বই এমনিতেই চলে আসছে। এটাও পরিষ্কার নয় যে স্ক্যান করা এই বই শুধু AI ট্রেনিংয়েই ব্যবহার হচ্ছে, নাকি একই ভবনে থাকা অ্যামাজনের প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড ব্যবসার সাথেও এর কোনো সম্পর্ক আছে। তবে এটুকু নিশ্চিত - বই কাটা হচ্ছে, স্ক্যান করা হচ্ছে, আর মূল কপি ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
কেন পুরনো আর দুষ্প্রাপ্য বই এত মূল্যবান AI-এর কাছে
এখন প্রশ্ন হলো – অ্যামাজনের মতো একটা কোম্পানি, যাদের হাতে ইন্টারনেটের প্রায় পুরো ডেটাই আছে, তারা কেন কষ্ট করে পুরনো বই কিনে কাটাকাটি করছে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে AI ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় সংকটে। বড় ভাষা মডেলগুলো (LLM) ইতিমধ্যে ইন্টারনেটে থাকা প্রায় সব লেখা টেক্সট দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে গেছে। নতুন, তাজা, উচ্চমানের ডেটার আকাল দেখা দিয়েছে। আর যেসব বই কখনো ডিজিটাইজ হয়নি, ইন্টারনেটে নেই, ছাপা হয়েছিল জেনারেটিভ AI আসারও আগে – সেগুলো এক অর্থে "সোনার খনি"। কারণ:
এই লেখা দিয়ে মডেল ট্রেন করলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা AI-জেনারেটেড লেখার পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায় (একে বলে "মডেল কোল্যাপস"-এর ঝুঁকি কমানো)। এসব লেখা অনন্য, আগে কখনো কোনো মডেল দেখেনি। বই আকারে থাকা লেখা সাধারণত মানসম্মত, সম্পাদিত, ভাষাগতভাবে সমৃদ্ধ।
শুধু বই নয় - ডেটার খোঁজে গোটা ইন্ডাস্ট্রিই ছুটছে
অ্যামাজনের বই-কাণ্ড আসলে একটা বড় চিত্রের ছোট্ট একটা অংশ মাত্র। AI কোম্পানিগুলো এখন যে কোনো উপায়ে প্রশিক্ষণ ডেটা খুঁজছে:
অ্যামাজনের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম Twitch-এ স্ট্রিমারদের ডিফল্টভাবে এমন একটা প্রোগ্রামে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের স্ট্রিম, ক্লিপ, ছবি আর চ্যাট লগ AI প্রশিক্ষণে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া থাকে – যতক্ষণ না তারা নিজে থেকে অপশনটা বন্ধ করছেন।
দেউলিয়া হয়ে যাওয়া স্পিরিট এয়ারলাইন্সের প্রায় ১০ কোটি ইমেইল আর ৫০ কোটি মাইক্রোসফট টিমস চ্যাট কিনে নিয়েছে গুগল, ১ কোটি ডলার দিয়ে।
আরও লক্ষণীয়, শুধু অ্যামাজন নয় – বই ধ্বংস করে ডিজিটাইজ করার এই পদ্ধতি এর আগেও আলোচনায় এসেছিল, যখন আদালতের মামলার নথি থেকে জানা যায় যে অন্তত আরেকটি বড় AI কোম্পানিও লক্ষ লক্ষ ছাপা বইয়ের পাতা কেটে স্ক্যান করে মূল কপি ফেলে দিয়েছিল। অর্থাৎ এটা এখন অনেকটাই "শিল্প-চর্চা"য় পরিণত হয়েছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্নগুলো
প্রযুক্তিগতভাবে এই পদ্ধতি হয়তো "দক্ষ" – কম সময়ে বেশি বই স্ক্যান করা যায় বাঁধাই কেটে ফেললে। কিন্তু নৈতিক আর আইনি দিক থেকে প্রশ্ন অনেক:
কপিরাইটের প্রশ্ন: লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ছাড়া তাদের লেখা AI মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা কতটা বৈধ – এই প্রশ্নে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে একাধিক মামলা চলছে। একটা কপি কিনে ফেললেই কি সেটা মডেল ট্রেনিংয়ে ব্যবহারের অধিকার এনে দেয়? এই প্রশ্নের সুরাহা এখনো হয়নি।
জ্ঞান সংরক্ষণের প্রশ্ন: যেসব বই বিরল, একমাত্র অবশিষ্ট কপি, বা আর ছাপা হয় না – সেগুলো একবার কাটা পড়লে চিরতরে হারিয়ে যায়। লাইব্রেরি, আর্কাইভ, বইপ্রেমীদের কাছে এটা শুধু একটা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং মানব সভ্যতার সংস্কৃতির একটা অংশ হারানোর মতো ঘটনা।
স্বচ্ছতার প্রশ্ন: পরিচয় গোপন রেখে বই কেনা, নাম-না-জানা বায়ারদের মাধ্যমে বাল্ক অর্ডার করা – এই পুরো প্রক্রিয়াটাই বেশ গোপনীয়ভাবে চালানো হচ্ছিল। সাধারণ মানুষ জানতেও পারতো না, যদি না একজন বইবিক্রেতা সন্দেহ করে ট্র্যাকার বসাতেন।
শেষ কথা
গল্পটা শুনতে অনেকটা থ্রিলার মুভির মতো লাগলেও, এটা বাস্তব। একটা বইয়ের পাতায় লুকানো ছোট্ট ট্র্যাকার একটা গোটা শিল্পের ভেতরের চিত্র সবার সামনে নিয়ে এসেছে। AI-এর ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে আমরা কতটা মূল্য দিচ্ছি – কতগুলো অপরিবর্তনীয়, দুষ্প্রাপ্য বই হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে।
এই প্রশ্নটা এখন সময়ের সাথে সাথে আরও জোরালো হচ্ছে। প্রযুক্তি এগোবে, এটা ঠেকানো যাবে না। কিন্তু সেই অগ্রগতির দাম যেন মানুষের সম্মিলিত জ্ঞান আর সংস্কৃতি না হয়ে দাঁড়ায় – এই প্রশ্নটা তোলার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।
তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদনটি মূলত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠান 404 Media-র মূল অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি, যা পরবর্তীতে TechCrunch, Snopes, Futurism-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত হয়েছে।
