শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১: বাবার মৃত্যুসংবাদ

 

শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১: বাবার মৃত্যুসংবাদ
Image: Ai Generated

সকালের আকাশ তখনও পুরোপুরি আলোকিত হয়নি। বন্দর শহর পোর্তো ভেলিয়োর সরু গলিতে কুয়াশা জমে ছিল, আর সমুদ্রের নোনা গন্ধ বাতাসে মিশে ছিল এক চিরচেনা অস্বস্তির মতো। কাঠের বাড়িগুলোর ছাদ থেকে এখনও রাতের শিশির ঝরে পড়ছিল টুপটাপ শব্দে, আর দূরে কোথাও একটা ঘণ্টা বাজছিল, ধীর ও একঘেয়ে — যেন শহরটা নিজেই এখনও ঘুম থেকে পুরোপুরি জাগেনি।


লুকাস মোরেনো তখন বাজারের দিকে হাঁটছিল, হাতে একটা খালি ঝুড়ি, মনে কোনো বিশেষ চিন্তা ছাড়াই। বাড়ির জন্য মাছ কিনতে হবে, আর যদি সময় থাকে, পুরনো বন্ধু তোমাসের সাথে একটু গল্প করবে বন্দরের পাথুরে ঘাটে বসে। বিশ বছরের জীবনে এমন সকাল তার কাছে হাজারবার এসেছে — একঘেয়ে, নিরাপদ, চেনা। সে জানত না, আজকের সকালটা তার জীবনের শেষ "সাধারণ" সকাল।


কিন্তু আজ বন্দরের চেহারা অন্যরকম লাগছিল।


মানুষ জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাটের কাছে। কারো মুখে ফিসফাস, কারো চোখে করুণা মেশানো দৃষ্টি — যা লুকাসের দিকেই ছুটে আসছিল বারবার। প্রথমে সে ভাবল, হয়তো অন্য কারো জন্য এই আয়োজন। কিন্তু যখন বুড়ো নাবিক এস্তেবান তার কাঁধে হাত রাখল, লুকাস বুঝতে পারল কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছে।


"বাবা...?" লুকাসের গলা কেঁপে উঠল।


এস্তেবানের থেকে চোখ নামিয়ে নিল সে। তার হাত কাঁপছিল। "দিয়েগো... তোমার বাবার জাহাজ কাল রাতে ফিরে এসেছে। কিন্তু দিয়েগো ছিল না তাতে।"


লুকাসের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল। শব্দহীন, তবু প্রচণ্ড।


"কী বলছেন আপনি?" সে জিজ্ঞেস করল, যদিও জানত উত্তরটা কী হতে পারে।


"একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল সমুদ্রে। ঝড়ের মধ্যে। জাহাজের বাকি ক্রুরা বলছে, দিয়েগো... সে আর ফেরেনি।"


কথাগুলো লুকাসের কানে পৌঁছাচ্ছিল, কিন্তু মস্তিষ্ক যেন সেগুলো মেনে নিতে অস্বীকার করছিল। বাবা তো কতবার সমুদ্রে গিয়েছে, কতবার ঝড়ের মধ্যে দিয়ে ফিরে এসেছে হাসিমুখে, গল্প শুনিয়েছে সমুদ্রদানব আর দূরদেশের বন্দরের। এবার কেন ফিরবে না?


সে দৌড়াতে শুরু করল ঘাটের দিকে। ভিড় ঠেলে, মানুষের করুণাভরা চোখ এড়িয়ে, সে পৌঁছাল সেই জাহাজের কাছে যেখানে তার বাবা শেষবার উঠেছিল। জাহাজটা ভাঙাচোরা, পাল ছেঁড়া, কাঠামোয় ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। কিন্তু জাহাজের ডেকে দিয়েগো মোরেনো নেই।


ক্যাপ্টেন — এক মোটাসোটা, ক্লান্ত চেহারার মানুষ — লুকাসের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল। "আমি দুঃখিত, ছেলে। আমরা সবকিছু করেছিলাম। কিন্তু ঢেউ... ঢেউ তাকে টেনে নিয়ে গেল। আমরা খুঁজেছি, কিন্তু..."


"তার শরীর?" লুকাস জিজ্ঞেস করল, নিজের গলার স্বর নিজের কাছেই অচেনা লাগছিল।


ক্যাপ্টেন মাথা নাড়ল। "পাওয়া যায়নি।"


লুকাস জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। ঢেউগুলো শান্ত, প্রায় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আছড়ে পড়ছিল জাহাজের গায়ে, যেন গতকালের সেই ভয়ংকর ঝড়ের কোনো চিহ্নই নেই তাদের মধ্যে। দিগন্তের কাছে সূর্য তখন সবে উঠছে, লাল-কমলা আলোয় পানির উপরিভাগ চিকচিক করছিল — এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য, যা আজকের দিনের নিষ্ঠুরতার সাথে একেবারেই বেমানান লাগছিল। সমুদ্র কতটা নিষ্ঠুরভাবে উদাসীন হতে পারে, লুকাস আজ প্রথমবার বুঝল। এই একই পানি, যা এখন এত শান্ত, এত নিরীহ দেখাচ্ছে, গতকাল রাতে হয়তো তার বাবাকে টেনে নিয়েছে অতল গভীরে — আর আজ সকালে যেন কিছুই হয়নি, এমনভাবে সে ঝিলমিল করছে।


এভাবে কি একজন মানুষ হারিয়ে যেতে পারে? কোনো চিহ্ন না রেখে?


সে জাহাজের ডেকের কাঠে হাত বুলাল, যেন সেই স্পর্শের মধ্যে দিয়ে বাবার শেষ মুহূর্তের কোনো আভাস পাওয়া যাবে। কিন্তু কাঠ ছিল ঠান্ডা, নিস্তব্ধ, নির্বাক।


বাড়ি ফেরার পথটা লুকাসের কাছে অসীম মনে হচ্ছিল। প্রতিটা পরিচিত রাস্তা, প্রতিটা দোকানের সামনে দাঁড়ানো মানুষ — সবকিছু আজ অচেনা লাগছিল, যেন পুরো শহরটাই হঠাৎ বদলে গেছে তার চোখের সামনে।


মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার মুখ দেখেই লুকাস বুঝল, খবরটা তার কাছেও পৌঁছে গেছে। কোনো কথা হলো না তাদের মধ্যে — শুধু মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন, আর দুজনেই দাঁড়িয়ে রইলেন সেই নীরবতার মধ্যে, যেখানে কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।


পরের কয়েকদিন লুকাসের কাছে ঝাপসা স্মৃতির মতো মনে হলো। আশেপাশের মানুষজন ও প্রতিবেশীদের সমবেদনা, ছোট বোন এলেনার প্রশ্ন — "বাবা কবে ফিরবে?" — যার উত্তর দেওয়ার সাহস লুকাসের ছিল না। এলেনার বয়স মাত্র আট বছর; সে এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি মৃত্যু মানে কী, শুধু বুঝেছিল বাবার চেয়ার এখন খালি পড়ে থাকে রাতের খাবারের টেবিলে, আর সেই শূন্যতা প্রতিটি সন্ধ্যায় আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল।


মা প্রায় কথাই বলতেন না এই দিনগুলোয়। তিনি ঘরের কাজ করে যেতেন যান্ত্রিকভাবে — রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর গোছানো — যেন কাজের মধ্যে ডুবে থেকে দুঃখটাকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। লুকাস লক্ষ্য করত, মা মাঝেমধ্যে বাবার পুরনো কোটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তারপর আবার চুপচাপ সেটা ভাঁজ করে রেখে দিতেন আলমারিতে।


কিন্তু এসবের মধ্যেও একটা প্রশ্ন লুকাসের মনে বারবার ফিরে আসছিল, যেটা সে কাউকে বলতে পারছিল না।


কেন দিয়েগো মোরেনো, যে গত পনেরো বছর ধরে সমুদ্রে নাবিকতা করছে, যে ঝড়ের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছিল বলে মজা করত — সে কীভাবে এমন এক সাধারণ ঝড়ে হারিয়ে যেতে পারে?


লুকাস জাহাজের ক্রুদের সাথে আরও কথা বলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের চোখে কিছু একটা ছিল — অস্বস্তি, তাড়াহুড়ো, যেন তারা দ্রুত এই বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইছিল। একজন তরুণ নাবিক, যে দিয়েগোর সাথে কাজ করত, লুকাসের চোখের দিকে তাকাতেই পারল না যখন সে জিজ্ঞেস করল ঝড়ের আগে ঠিক কী হয়েছিল।


"আমি... আমার কাজ আছে," বলেই ছেলেটা দ্রুত হেঁটে চলে গেল, লুকাসকে একা দাঁড় করিয়ে রেখে বন্দরের কোলাহলের মধ্যে। সেই মুহূর্তেই লুকাসের মনে প্রথমবারের মতো একটা ঠান্ডা অনুভূতি জেগে উঠল — এই যে সবাই এত তাড়াহুড়ো করছে বিষয়টা ভুলে যেতে, এটা কি স্বাভাবিক শোক, নাকি অন্য কিছু?


সেই রাতে, ঘরের কোণে বসে, লুকাস তার বাবার একটা পুরনো ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। ছবিতে দিয়েগো মোরেনো হাসছে, পেছনে সমুদ্র, চোখে সেই চিরচেনা দুরন্ত দৃষ্টি — যেন সবসময় কোনো নতুন দিগন্তের কথা ভাবছে।


*বাবা, তুমি কি সত্যিই শুধু একটা দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেলে? নাকি...*


জানালার বাইরে বাতাস বইছিল ধীরে ধীরে, দূর থেকে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছিল — সেই একই সমুদ্র, যে তার বাবাকে গিলে নিয়েছে, অথচ এখনও ঠিক আগের মতোই শান্ত, রহস্যময়, উদাসীন শোনাচ্ছিল।


লুকাস তখনও জানত না যে, এই প্রশ্নটাই তার জীবনের পরবর্তী কয়েক মাসের গতিপথ বদলে দেবে। সে জানত না, বাবার মৃত্যুর পেছনে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা কেউ তাকে জানতে দিতে চায় না। এই মুহূর্তে সে শুধু একজন শোকাহত ছেলে, যে তার বাবাকে হারিয়েছে সমুদ্রের কাছে — কিন্তু সেই শোকের ভেতরেই, নিজের অজান্তে, একটা প্রশ্ন শিকড় গেড়ে বসছিল, যা ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যাবে এমন এক পথে, যেখান থেকে ফেরা সহজ হবে না।


কিন্তু আজ রাতে, জানালার পাশে বসে, লুকাস শুধু একটা জিনিসই অনুভব করছিল — এক গভীর, অব্যাখ্যেয় নিশ্চয়তা যে গল্পটা এখানেই শেষ নয়।


আর ঠিক তখনই, ঘরের বাইরের অন্ধকার গলিতে, কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল — নিঃশব্দে, লুকাসদের বাড়ির জানালার দিকে তাকিয়ে। যে মুহূর্তে লুকাস উঠে দাঁড়াল আলো নিভিয়ে দিতে, ছায়াটা নিঃশব্দে সরে গেল অন্ধকারের গভীরে — যেন কখনও কেউ সেখানে ছিলই না।


Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!