![]() |
| প্রতীকী ছবি: AI Generated |
আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, কেনো বাংলা অক্ষরগুলো গোল আর প্যাঁচানো, কেনো ডানদিক থেকে আরবি লেখা শুরু হয় আর কেনো চীনা লেখার প্রতিটা অক্ষর ছোট্ট একটা ছবির মতো?
তিনটা ভাষাই হাজার বছরের পুরনো। অথচ দেখতে একদমই আলাদা। কেন এমন হলো? চলুন আজকে এই তিন লিপির জন্মকাহিনি জেনে নিই। কবে শুরু হলো, কীভাবে বদলেছে, আর কেন এত ভিন্ন হয়ে গেল এদের লেখার ধরন।
বাংলা লিপি
বাংলা লিপির শেকড় লুকিয়ে আছে ব্রাহ্মী লিপিতে। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, ব্রাহ্মী লিপি খ্রিস্টপূর্ব শেষ কয়েক শতক এবং খ্রিস্টীয় প্রথম শতকগুলোতে ভারত উপমহাদেশ ও মধ্য এশিয়ায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সম্রাট অশোকের শিলালিপি ও স্তম্ভলিপিতে ব্রাহ্মী লিপির পরিণত রূপ পাওয়া যায় এছাড়া বাংলাদেশের বগুড়ার মহাস্থানগড়েও মৌর্য আমলের ব্রাহ্মী লিপির নমুনা মিলেছে। বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মী লিপির উত্তর ভারতীয় রূপ থেকে কুষাণ লিপি, আর কুষাণ লিপি থেকে গুপ্ত লিপির জন্ম হয়। এই গুপ্ত লিপির ধারা থেকেই গৌড়বঙ্গের প্রাচীন গৌড়ী লিপি এবং পরে বাংলা লিপি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।
তবে বাংলা লিপির সঠিক উৎস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনও পুরোপুরি ভিন্নমত আছে। বাংলা লিপির ব্যবহার মূলত খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে প্রচলিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তখন এটি মধ্যযুগীয় পূর্ব ভারত ও পাল সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত হতো।
আজকের ছাপার বাংলা হরফের গোড়াপত্তন হয় ১৭৭৮ সালে, যখন চার্লস উইলকিন্স প্রথম বাংলা অক্ষরের ছাপার টাইপ তৈরি করেন আর পণ্ডিত পঞ্চানন কর্মকার সেটাকে আরও মার্জিত রূপ দেন। পরে ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়-এর মাধ্যমে বর্ণমালা ঢেলে সাজিয়ে ও শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রয়োগ ঘটিয়ে আজকের প্রচলিত রূপ দিতে বড় ভূমিকা রাখেন।
অর্থাৎ বাংলা লিপির আধুনিক চেহারা একজনের একার কাজ নয়, কয়েক দশক ধরে একাধিক মানুষের হাতে গড়ে ওঠা একটা প্রক্রিয়া। বাংলা লিপির ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গবেষণা করেছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, যার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে।
আরবি লিপি
আরবি লিপি বা অক্ষরকে অনেকেই চেনেন পবিত্র কুরআনের ভাষা হিসেবে। কিন্তু এই লিপিরও নিজস্ব লম্বা এক ইতিহাস আছে। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, আরবি বর্ণমালার উৎপত্তি আরামীয় লিপি থেকে, যা খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে প্রচলিত ছিল। তবে আরামীয় লিপিতে ব্যঞ্জনবর্ণের সংখ্যা আরবি ভাষার তুলনায় কম ছিল বলে একই বর্ণ দিয়ে একাধিক ধ্বনি বোঝাতে হতো।
আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, নাবাতীয় আরামীয় উইকিপিডিয়া নিবন্ধ অনুযায়ী আরবি লিপি সম্ভবত নাবাতীয় আরামীয় লিপির প্রবাহী বা পেঁচানো এক রূপভেদ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের দিকে বিকশিত হয়েছিল। এটিই এখনকার মূলধারার মত, যদিও কিছু গবেষক আগে সিরিয়াক লিপি থেকে আরবির উদ্ভবের কথা বলেছিলেন, আর সেই মতটি এখন মোটামুটি প্রান্তিক হিসেবে গণ্য হয়।
আরামীয় লিপির ওই দ্ব্যর্থতা দূর করতে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে বর্ণের নিচে বা উপরে ফোঁটা বা অতিরিক্ত চিহ্ন বসানো শুরু হয়। এই চিহ্নগুলোই আরবিকে একটা আলাদা, স্বতন্ত্র লিপি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।
Roar বাংলার একটি লেখা অনুযায়ী, ধ্রুপদী আরবি ভাষা খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে প্রচলিত, আর এই ভাষাতেই কুরআন লেখা হয়েছে। কুরআন লেখার সময় আরবির সাতটি উপভাষা প্রচলিত থাকলেও, পরে কুরাইশ উপভাষার সংস্করণটিই মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
চীনা লিপি
চীনা লিপি একেবারেই অন্যরকম এক জগৎ। এখানে প্রতিটা অক্ষর সাধারণত একটা উচ্চারণ-একক (সিলেবল) আর একটা অর্থবহ অংশ বহন করে, বর্ণমালার মতো শুধু ধ্বনি বোঝায় না। তবে একটা অক্ষর সবসময় একটা সম্পূর্ণ শব্দ নয়, অনেক চীনা শব্দই দুই বা তার বেশি অক্ষর মিলে তৈরি হয়।
বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, চীনা অক্ষরের সবচেয়ে পুরোনো রূপ হলো 'অরাকল বোন লিপি'। প্রাচীনকালে চীনের রাজারা গরুর হাড় ও কচ্ছপের খোলের ওপর এই লেখাগুলো খোদাই করতেন। যুদ্ধ, ফসল বা আবহাওয়ার ভবিষ্যৎ জানতে তারা এই হাড়গুলো আগুনে পোড়াতেন। এর মূল কারণ ছিল, তারা বিশ্বাস করত আগুনের তাপে হাড়ে যে ফাটল বা রেখা তৈরি হতো, তা আসলে দেবতা ও তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের দেওয়া পবিত্র উত্তর বা গোপন সংকেত। জ্যোতিষীরা সেই ফাটলগুলো দেখে ভবিষ্যৎ বাণী বুঝতে পারতেন এবং ফাটলের পাশেই তার বিবরণ লিখে রাখতেন।
শাং রাজবংশ চীন শাসন করেছে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত, অর্থাৎ অরাকল বোন লিপির বয়স তিন হাজার বছরেরও বেশি। সময়ের সাথে সাথে সীলমোহর লিপি গড়ে ওঠে, আর তা থেকে জন্ম নেয় করণিক লিখনশৈলী। ছিন রাজবংশের আমলে দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী সহজ রূপ তৈরির প্রয়োজন থেকেই এই লিখনশৈলীর উদ্ভব হয়।
বিংশ শতকে এসে চীনা লিখন পদ্ধতি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, সরলীকৃত ও ঐতিহ্যবাহী চীনা অক্ষর। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে চীন সরকার সরলীকৃত চীনা অক্ষর প্রবর্তন করে, লেখার গতি বাড়ানো আর অক্ষর মুখস্থ করা সহজ করার লক্ষ্যে। আজ মূল ভূখণ্ড চীনে সরলীকৃত রূপই সরকারি মান, আর তাইওয়ান, হংকং, ম্যাকাওয়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী রূপ চালু আছে।
এবার আসল প্রশ্নে হলো এই তিন ভাষার অক্ষর দেখতে এত আলাদা লাগে কেন?
কারণ এদের শেকড় একেবারে আলাদা তিনটা পরিবারে। বাংলা লিপি এসেছে ব্রাহ্মী লিপির ধারা থেকে, যেখানে একটা অক্ষরে ব্যঞ্জনবর্ণ আর স্বরবর্ণ একসাথে জোড়া লাগানো থাকে, আর লেখা হয় বাম থেকে ডানে। আরবি লিপি এসেছে আরামীয় ও ফিনিশীয় লিপির ধারা থেকে, যেখানে মূলত ব্যঞ্জনবর্ণ লেখা হয় আর লেখার ধরনটা প্রবাহী, জোড়া লাগানো। লেখা হয় ডান থেকে বামে।
আর চীনা লিপি এই দুই পরিবারের কারোর সাথেই সম্পর্কিত নয়। এটা গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক পথে, যেখানে একেকটা অক্ষর একেকটা উচ্চারণ-একক আর অর্থের টুকরো বহন করে, একাধিক অক্ষর মিলে শব্দ তৈরি হয়, আর এটা মোটেও ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালা নয়। তিনটা লিপিই হাজার হাজার বছরের আলাদা আলাদা ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ভাষার প্রয়োজন থেকে গড়ে উঠেছে। তাই চেহারায় মিল না থাকাটাই স্বাভাবিক।
বাংলা, আরবি আর চীনা, এই তিন লিপির গল্প আসলে তিনটা আলাদা সভ্যতার গল্প। একটা পাথরে খোদাই করা রাজার আদেশ থেকে, একটা মরুভূমির বাণিজ্য পথ থেকে, আর একটা হাড়ের ওপর ভবিষ্যৎবাণী থেকে জন্ম নিয়েছে আজকের এই লেখার ধরনগুলো। পরের বার যখন বাংলা, আরবি বা চীনা লেখা দেখবেন, মনে রাখবেন এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের এক দীর্ঘ যাত্রা।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
বাংলা লিপি কি সরাসরি ব্রাহ্মী লিপি থেকে এসেছে?
সরাসরি নয়। ব্রাহ্মী লিপি থেকে ধাপে ধাপে, কুষাণ ও গুপ্ত লিপি হয়ে, তারপর গৌড়ী লিপির মধ্য দিয়ে বাংলা লিপি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়। তবে এই বিবর্তনের সুনির্দিষ্ট ধাপ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনও ভিন্নমত আছে।
আরবি আর বাংলা লিপির মধ্যে কি কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে?
না, দুটো লিপির সরাসরি কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। বাংলা লিপি ব্রাহ্মী লিপির ধারার, আর আরবি লিপি আরামীয় ও ফিনিশীয় লিপির ধারার।
চীনা ভাষায় সাধারণ পড়াশোনা চালানোর জন্য কতগুলো অক্ষর জানতে হয়?
বাংলা উইকিপিডিয়ায় উল্লেখিত চীনে পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী, কাজ চালানোর মতো সাক্ষরতার জন্য সাধারণত তিন হাজার থেকে চার হাজার চীনা অক্ষরের জ্ঞান প্রয়োজন হয়।
সোর্স: বাংলা উইকিপিডিয়া (বাংলা লিপি, আরবি লিপি, আরবি বর্ণমালা, নাবাতীয় আরামীয়, আরামীয় লিপি, চার্লস উইলকিন্স, চীনা লিখন পদ্ধতি, চীনা অক্ষর, প্রথাগত চীনা অক্ষর, চীন), বাংলাপিডিয়া (বাংলালিপি, উইলকিন্স স্যার চার্লস), Roar বাংলা আর্কাইভ (আরবি ভাষার জন্ম ও ক্রমবিকাশ)
.webp)