শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১০: সিদ্ধান্ত

Image: Ai Generated


পুঁটলিটা সে খুলল না। সারা রাত সেটা জামার নিচে বুকের সাথে চেপে ধরে রইল, আর অপেক্ষা করল।

বাড়ি ফিরে এসে লুকাস নিঃশব্দে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়েছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করতে পারেনি। ঘরের ভেতর মা আর এলেনার নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ, বাইরে সমুদ্রের একঘেয়ে গর্জন। আগন্তুকের সেই ঠান্ডা কণ্ঠ বারবার কানে বাজছিল। ওকে খেলতে দাও। যদি সে এখন এখানে বসে পুঁটলিটা খোলে, আর ওরা কোনোভাবে জানতে পারে? যদি জানালার বাইরে কেউ থাকে? সে ঠিক করল, ভোর হওয়ার আগে নয়।

ভোরের প্রথম আলো আসতেই সে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের চুলার পেছনের আলগা পাথরটা সরিয়ে মানচিত্রটা বের করে নিল, তারপর সেই ছোট কুঠুরিতে চলে গেল, ভেতর থেকে দরজা এঁটে দিল। মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের ওপর পুঁটলিটা রাখল। তেলকাপড়ের মুখের সেই জটিল গিঁট। লুকাস গভীর শ্বাস নিয়ে আঙুলগুলো চালাল, ঠিক যেমনটা বাবা শিখিয়েছিলেন। প্রথমে ডানে এক পাক, তারপর নিচ দিয়ে টান, তারপর উল্টো ঘুরিয়ে। গিঁটটা নরম হয়ে খুলে গেল, যেন নিজে থেকেই আত্মসমর্পণ করল।

ভেতরে ছিল দুটো জিনিস।

প্রথমটা একটা ভাঁজ করা ভেড়ার চামড়ার টুকরো, তেলে ভেজানো। লুকাসের নিঃশ্বাস থমকে গেল। সে কাঁপা হাতে সেটা খুলল, তারপর মানচিত্রটা টেবিলে বিছাল। ছেঁড়া কোণটা সে নিচের ডান দিকে বসাল। কিনারার ফ্যাকাশে ছেঁড়া দাগ ঠিক ঠিক মিলে গেল, একটা ভাঙা ঝিনুকের দুই অংশের মতো।

মানচিত্রটা এবার পূর্ণ হলো, আর পূর্ণ হতেই লুকাসের চোখের সামনে এক নতুন জগৎ খুলে গেল।

সাত দ্বীপের অর্ধবৃত্তের মাঝখানে, চতুর্থ দ্বীপের চারপাশে, বাবা একটা সরু খাঁড়ির রেখা এঁকেছেন, যা দুই পাথুরে প্রাচীরের মাঝখান দিয়ে দ্বীপের ভেতরে ঢুকে গেছে। তার পাশে ছোট অক্ষরে লেখা: "ভোরের ভাটায় প্রবেশ। অন্য সময় পাথর।" আর পথের নিচে, সমুদ্রের ওপর, একটা ছোট হিসাব: "চল্লিশ দিন, যদি বাতাস সদয় থাকে।"

চল্লিশ দিন। সাগরের চল্লিশ দিন।

লুকাস স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। চল্লিশ দিন মানে চল্লিশটা সকাল, চল্লিশটা রাত, চল্লিশবার সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত, শুধু আকাশ আর পানির মাঝখানে। কেউ কি এতদিন কূল না দেখে থাকতে পারে? তার কল্পনায় ভেসে উঠল অন্তহীন নীল, দৈত্যাকার ঢেউ, আর রাতের কালো আকাশে অচেনা তারার সারি। ভয়ে তার পেট গুলিয়ে উঠল, কিন্তু সেই ভয়ের নিচে আরেকটা অনুভূতিও নড়ে উঠছিল, যা সে আগে কখনও টের পায়নি। এক তীব্র, অদম্য কৌতূহল।

দ্বিতীয় জিনিসটা ছিল একটা ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজ। এটা খুলতেই বাবার হাতের চিরচেনা লেখা:

"লুকাস, যদি তুমি এই গিঁট খুলতে পেরে থাকো, তাহলে তুমি আমার ছেলে, আর আমি তোমাকে ঠিকই চিনতাম। এই কোণে পথের শেষ অংশ। কিন্তু মানচিত্রই সব নয়। আমি আরও কিছু লুকিয়ে রেখেছি, যা ছাড়া এই পথ তোমাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে। "এস্তেলা নেগ্রা" তোমাকে বলবে, জাহাজকে ছেড়ো না।

আর শোনো। আমি তোমাকে কোনোদিন কিছু চাপিয়ে দিতে চাইনি। যদি তুমি যেতে না চাও, ফিরে যাও। মায়ের কাছে থেকো, এলেনাকে দেখো, একটা শান্ত জীবন কাটাও। আমি বুঝব। কোনো ছেলেকে তার বাবার পাপের বোঝা বইতে হয় না।

তবে যদি যাও, ছেলে, তবে সত্যিটা জেনো। আমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে বিশ্বাস করেছিলাম, আর সেই বিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"

লুকাস অনেকক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। মোমবাতির শিখা কাঁপছিল। কোনো ছেলেকে তার বাবার পাপের বোঝা বইতে হয় না। বাক্যটা তার বুকে গিয়ে বিঁধল। বাবা তাকে মুক্তি দিয়ে গেছেন, বিনা শর্তে। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই, লুকাস টের পেল, এই মুক্তিটা কতটা ভারী।

সবচেয়ে ভালো বন্ধু। কে? এস্তেবান? সেই তৃতীয় ব্যক্তি? নাকি অন্য কেউ? উত্তর নেই।

সে মানচিত্র, পুঁটলি আর চিঠি আবার সযত্নে গুছিয়ে জামার নিচে, বুকের সাথে বেঁধে নিল। চুলার পেছনের গর্তে ফেরানোর সুযোগ পরে হবে। বাইরে তখন ভোর ফুটে উঠছে। জানালার ফাঁক দিয়ে গোলাপি আলো ঢুকছিল, সমুদ্রের ওপর কুয়াশা পাতলা হয়ে উঠছে, আর দূরের টিলায় গির্জার চূড়া সোনালি আভায় জ্বলে উঠছে। এমন এক সুন্দর সকাল, যা তার ভেতরের ঝড়ের সাথে একেবারেই বেমানান।

রান্নাঘরে পৌঁছে লুকাস থমকে গেল। মা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে, পিঠ তার দিকে ফেরানো। তাঁর কাঁধ ঝুঁকে পড়া, চুলে হঠাৎ কত সাদা ছোপ। ঠান্ডা ভাতের পাত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তাঁর হাত আস্তে আস্তে কাঁপছিল। তাকের ওপর পড়ে থাকা আটার থলেটা প্রায় খালি। কোণে এলেনার জুতোজোড়া, সামনের দিকটা ফেটে হাঁ হয়ে আছে।

লুকাসের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। বাবা নেই। আয় নেই। এই সংসারের সবকিছু এখন তার কাঁধে। আর ঠিক এই মুহূর্তে সে যাচ্ছে সমুদ্রের ওপারে, অনিশ্চয়তার দিকে।

যদি তুমি যেতে না চাও, ফিরে যাও।

কিন্তু ফিরে যাবে কোথায়? ওই লোকটা এই বন্দরেই আছে। সে এলেনাকে লজেন্স দিয়েছে। সে লুকাসের প্রতিটা পা অনুসরণ করছে। এখানে বসে থাকলেও মা আর এলেনা নিরাপদ নয়। বরং যতক্ষণ না সে এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত যায়, ততক্ষণ কেউ নিরাপদ নয়। আর তার চেয়েও বড় কথা, সে নিজের কাছে মিথ্যে বলতে পারছিল না। শেষ রাতে বাবার মুখের ওপর যে "আমি পারব না" বলেছিল, সেই কথাটা তাকে সারা জীবন তাড়া করবে, যদি আজ সে আবার একই কথা বলে।

"মা," সে ধীরে ডাকল।

মা ঘুরে তাকালেন। তাঁর চোখ ফোলা, তবু দৃষ্টি স্থির।

"আমি বাবার জাহাজটা সারাতে চাই," লুকাস বলল, প্রতিটা শব্দ ওজন করে। "ওটাকে নিয়ে আমি সমুদ্রে যাব। উপকূল ধরে মাল টানার কাজ করব। যা আয় হবে, সংসারে দেব।"

কথাটা অর্ধেক সত্যি, অর্ধেক মিথ্যে, আর এই অর্ধেক মিথ্যেটাই তার গলায় কাঁটার মতো বিঁধল।

মা অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। এলেনার ঘুমন্ত নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছিল পাশের ঘর থেকে। শেষে তিনি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললেন, "তোর বাবাও এভাবেই বলেছিল। প্রথমবার। উপকূলের কাজ।"

লুকাস নিঃশব্দে মাথা নিচু করল।

"আমি জানি, তুই সব কথা বলছিস না," মা ধীরে ধীরে বললেন। "আর আমি জানি, আমি তোকে থামাতে পারব না। তোর বাবাকেও পারিনি।" তাঁর গলা কেঁপে গেল, কিন্তু তিনি নিজেকে সামলালেন। "শুধু একটা কথা দে, লুকাস। ফিরে আসবি তো।"

"আসব, মা।"

"মিথ্যে বলিস না।"

"আসব," সে আবার বলল, আর এবার তার কণ্ঠ কাঁপল না। "কথা দিচ্ছি।"

মা এগিয়ে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, শক্ত করে, কিছু না বলে। লুকাস চোখ বন্ধ করে সেই উষ্ণতা বুকে ভরে নিল, জানত না আবার কবে এমন করে ধরা যাবে।

ঠিক তখনই দরজায় কেউ জোরে জোরে টোকা দিল।

লুকাস দরজা খুলতেই দেখল, একটা অল্পবয়সী ছেলে, হাতে একটা সীলমোহর-করা চিঠি। "দিয়েগো মোরেনোর ঘরের জন্য," সে বলে চিঠিটা হাতে দিয়ে দৌড়ে মিলিয়ে গেল।

লুকাস সীল ভেঙে কাগজটা খুলল। কয়েকটা সরকারি-ধাঁচের লাইন, আর নিচে ক্যাপ্টেন ওলিভেরার সই:

"পাওনাদারদের স্বার্থে, মৃত দিয়েগো মোরেনোর ঋণ পরিশোধের জন্য, জাহাজ 'এস্তেলা নেগ্রা' দশ দিন পর নিলামে বিক্রি করা হবে।"

লুকাসের হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার বাবার কোনো ঋণ ছিল না। কখনও না। আর এখন, ঠিক যেদিন সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঠিক সেদিনই কেউ জাহাজটাকে তার হাত থেকে কেড়ে নিতে চাইছে।

দশ দিন। মাত্র দশ দিন।

পেছনে মা কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেলেন। লুকাস চিঠিটা মুঠোয় দলা পাকিয়ে লুকিয়ে ফেলল, আর বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা সত্য টের পেল: জাহাজ বাঁচাতে হলে চাই টাকা, আর তার পকেটে একটা তামার পয়সাও নেই। ওরা তাকে "খেলতে" দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খেলার নিয়মগুলো ওরাই ঠিক করছে।
Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!