![]() |
| Image: Ai Generated |
প্রথম দিন সকালেই লুকাস গেল বন্দর-দপ্তরে, যেখানে সমুদ্রের সব কাগজপত্র আর ঋণের খাতা রাখা হয়।
দপ্তরটা ছিল ঘাটের পাশে এক পুরনো পাথুরে বাড়ি, ভেতরে ধুলো আর কালির ঝাঁঝালো গন্ধ। জানালার কাছের উঁচু টেবিলে বসে ছিল রোগা, চশমা-পরা এক করণিক, যার আঙুলগুলো সারাক্ষণ কাঁপে। লুকাস নিজের নাম বলতেই লোকটা চোখ নামিয়ে নিল, যেন আগেই জানত সে আসবে।
"আমি দিয়েগো মোরেনোর ঋণের দলিলটা দেখতে চাই।"
করণিক অনিচ্ছায় একটা মোটা খাতা টেনে এনে একটা পাতা খুলে দিল। লুকাস ঝুঁকে পড়ল। চারশো রুপোর মুদ্রার ঋণ, কোনো এক বাণিজ্য-ঘরের নামে, আর নিচে বাবার সই।
কিন্তু লুকাসের চোখ আটকে গেল সইয়ের ওপর। বাবার "দ"-এর মাথায় সবসময় একটা ছোট্ট ফাঁস থাকত, যেটা এই সইয়ে নেই। কেউ নকল করেছে, ভালোভাবে, কিন্তু অভ্যাসটা নকল করতে পারেনি।
"এটা জাল," সে নিচু গলায় বলল। "আমার বাবার সই এমন ছিল না।"
করণিকের ঘাড় ঘেমে উঠল। "আমি... আমি শুধু খাতা রাখি, বাবা। আইন বলে, ঋণ প্রমাণিত হলে দশ দিনের মধ্যে শোধ না হলে জাহাজ নিলামে উঠবে। জাল প্রমাণ করতে মাসের পর মাস লেগে যায়, আদালতে, দূরের শহরে।" সে গলা আরও নামাল। "আর এই কাগজ... ওপর থেকে এসেছে। আমাকে ছোঁয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি।"
ওপর থেকে। কোন ওপর? কার হুকুমে একটা মৃত মানুষের নামে এমন নিখুঁত জাল দলিল তৈরি হয়, আর বন্দর-দপ্তরের করণিক পর্যন্ত তা ছুঁতে ভয় পায়? লুকাস বুঝল, এখানে আর কিছু পাওয়ার নেই। সে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল, আর সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে হিসাব কষল। চারশো মুদ্রা। দশ দিন। আর সম্বল প্রায় শূন্য।
দ্বিতীয় দিন। সে মাকে সব খুলে বলতে পারেনি, কিন্তু মা নিজেই এগিয়ে এলেন। সন্ধ্যায় রান্নাঘরের টেবিলে তিনি একটা পুরনো কাপড়ের পুঁটলি খুলে রাখলেন। ভেতরে রুপোর একটা ছোট্ট ব্রোচ, ফুলের নকশা কাটা, বহু বছরের পুরনো।
"এটা তোর বাবা আমাকে বিয়ের দিন দিয়েছিল," তিনি বললেন, তাঁর গলা অদ্ভুতভাবে শান্ত। "সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। কিন্তু তোর বাবার জাহাজের চেয়ে বড় না। বিক্রি করে দে।"
লুকাসের গলা বন্ধ হয়ে এল। "মা, না। আমি অন্য উপায়..."
"আমি বলছি, নিয়ে যা।" মা তার হাতে ব্রোচটা গুঁজে দিলেন, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সেই রাতে লুকাস অনেকক্ষণ ধরে তার ঠান্ডা, ছোট্ট ওজন হাতে নিয়ে বসে থাকল।
সেই রাতে বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, আর জানালার কাচে ফোঁটাগুলো আঁকাবাঁকা রেখা টানছিল। লুকাস ঘুমোতে পারেনি। বারবার তার মনে হচ্ছিল, এই ব্রোচটা মায়ের আঙুলের মতো, শেষ যে জিনিসটা তাঁর কাছে আছে বাবার স্মৃতির।
তৃতীয় দিন। স্বর্ণকারের দোকানে ব্রোচটা বিক্রি হলো সত্তর মুদ্রায়, যা সে আশা করেছিল তার চেয়ে অনেক কম। বাড়ি ফেরার পথে সে রান্নাঘরের তামার হাঁড়ি-কড়াইয়ের জন্য আরও ত্রিশ মুদ্রা জোগাড় করল। একশো। চারশোর এক-চতুর্থাংশ।
চতুর্থ দিন। এবার পথ দেখাল তোমাস। সে সারা সকাল ঘুরে ঘুরে জেলেপাড়ার প্রতিটা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি কথা বলে এসেছে। সন্ধ্যায় সে লুকাসের হাতে একটা ভারী থলে ধরিয়ে দিল। "ওরা কেউ বেশি দিতে পারেনি, কিন্তু সবাই কিছু না কিছু দিয়েছে। দিয়েগোকে সবাই চিনত।" থলেতে চল্লিশ মুদ্রা, আর তার নিচে তামার পয়সা, ঝিনুকের মালা, এমনকি একটা ছোট্ট ছুরিও। প্রতিটা জিনিস একটা ছোট্ট দান।
লুকাস কিছু বলতে পারল না। তোমাসকে কেবল জড়িয়ে ধরল। সন্দেহের সেই কাঁটাটা, গির্জার দিনের সেই কাঁটাটা, এই মুহূর্তে বড় লজ্জাকর মনে হলো।
পঞ্চম দিন। ভোরের কুয়াশা তখনও সরেনি, সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে, আর সমুদ্র ধূসর থেকে সোনালি হচ্ছে। সে ঘাটে কুলির কাজ নিল, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বস্তা টানল, মাছের ঝুড়ি বইল, কাঁধ আর পিঠ ব্যথায় ভেঙে পড়ল। মজুরি পঁচিশ মুদ্রা। হাতের তালুতে ফোসকা পড়ে ফেটে গেল, কাঁধের ওপর দড়ির দাগ বসে গেল। প্রতিটা বস্তা তোলার সময় সে ভাবছিল, বাবাও এভাবেই একদিন এই ঘাটে কাজ শুরু করেছিলেন, এই একই পাথরে পা রেখে। প্রতিটা তামার পয়সা সে দাঁতে চেপে গুনল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে লক্ষ্য করছিল, ঘাটের শেষ প্রান্তে এস্তেলা নেগ্রার ডেকে নতুন একটা প্রহরী, আর সরাইখানার সামনে ধূসর আলখাল্লার এক ছায়া, যে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। লুকাস মাথা নিচু করে কাজ করে গেল, যেন কিছুই দেখেনি।
ষষ্ঠ দিন। এস্তেবান এল তার ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে, লাঠিতে ভর দিয়ে, কাঁধে একটা পুরনো চামড়ার থলে। বুড়োর চোখ লাল।
"এটা আমি চল্লিশ বছর ধরে জমিয়েছি," সে বলল, থলেটা লুকাসের হাতে রেখে। "নিজের কবরের খরচের জন্য। দিয়েগোকে আমি একবার ফিরিয়ে দিয়েছি, ছেলে। এবার আর পারব না।"
লুকাস কাঁপা হাতে থলে খুলল। পঁয়তাল্লিশ রুপোর মুদ্রা, সবকটাই পুরনো, ক্ষয়ে যাওয়া, বহু হাত ঘুরে আসা। সে প্রতিবাদ করতে গেল, কিন্তু বুড়ো তার মুখের ওপর হাত রাখল। "না। এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত। নিতে দাও।"
সেদিন সন্ধ্যায় ফেলিপাও এল, মাছের ঝুড়ি কাঁধে, আর কোনো কথা না বলে চল্লিশটা মুদ্রা গুঁজে দিয়ে চলে গেল।
সপ্তম দিন সন্ধ্যায় লুকাস রান্নাঘরের টেবিলে সব মুদ্রা ঢেলে গুনল। মোমের আলোয় রুপো আর তামার স্তূপ চকচক করছিল। মা পাশে বসে, এলেনা হঠাৎ এসে একটা ছোট্ট মাটির ভাঁড় তার সামনে রাখল। "দাদা, আমারটাও নাও।" ভেতরে তিনটা তামার পয়সা। এলেনার ভাঙা জুতোর দিকে তাকিয়ে লুকাসের চোখ জ্বলে উঠল। সে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরল, আর একটা কথাও বলতে পারল না।
গোনা শেষ হলো। দুশো পঞ্চাশ। দুশো পঞ্চাশ মুদ্রা, সাত দিনের শ্রম, ভালোবাসা আর ত্যাগের ফসল।
চারশো থেকে এখনও দেড়শো কম। আর নিলামের বাকি মাত্র তিন দিন।
লুকাস টেবিলের ওপর মাথা নুইয়ে বসে রইল। বাইরে হাওয়া ঠান্ডা হয়ে উঠেছে, সমুদ্রের গর্জন গভীর। সে বুঝতে পারছিল না, আর কী করা যায়। সমস্ত দরজা সে কড়া নেড়েছে। যাদের কাছে চাইতে পারত, সবার কাছে চেয়েছে।
ঠিক তখনই সদর দরজার বাইরে কিছু একটা ভারী জিনিস মাটিতে পড়ার শব্দ হলো।
লুকাস লাফিয়ে উঠে দরজা খুলল। গলি অন্ধকার, খালি। কেউ নেই। শুধু দরজার চৌকাঠের কাছে পড়ে আছে একটা চামড়ার থলে, মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধা।
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে থলেটা তুলে নিল। ভারী। সে রান্নাঘরে ফিরে এসে টেবিলের ওপর সেটা উপুড় করল।
রুপোর মুদ্রা ঝনঝন করে ছড়িয়ে পড়ল। নতুন, চকচকে, ভারী, মসৃণ কিনারা। সবকটা একই ছাঁচের।
লুকাসের শরীর হিম হয়ে এল। মা অস্ফুট শব্দ করে মুখে হাত চাপা দিলেন।
সে এক এক করে গুনল। কাঁপা আঙুলে, নিঃশব্দে। একশো আটচল্লিশ, একশো উনপঞ্চাশ... একশো পঞ্চাশ।
ঠিক একশো পঞ্চাশ। ঠিক ততটা, যতটা কম পড়ছিল।
সে থলেটা তুলে ভেতরে হাত চালাল, চিঠি বা কোনো চিরকুট খুঁজল। কিছুই নেই। শুধু চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে একটা ক্ষীণ, মিষ্টি গন্ধ। লবঙ্গ।
মা ধীরে ধীরে ফিসফিস করলেন, "লুকাস, এই টাকা ফিরিয়ে দে। এতে ভালো কিছুর গন্ধ নেই।" লুকাস উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানত, মা ঠিকই বলছেন। কিন্তু সে এও জানত, বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর। আর মাত্র তিন দিন।
লুকাসের মনে হলো, ঘরের ভেতরের বাতাস হঠাৎ জমে গেছে। কেউ তার ঘরের টাকার হিসাব জানে। কেউ তাকে দেখছে, গুনছে, মেপে মেপে ঠিক সেটুকুই পাঠিয়েছে, যেটুকু দরকার।
ওকে খেলতে দাও।
আর সে এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে এই টাকা না নিলে জাহাজ চিরকালের জন্য চলে যাবে, আর নিলে সে চিরকালের জন্য ওদের হাতে বাঁধা পড়ে যাবে।
দপ্তরটা ছিল ঘাটের পাশে এক পুরনো পাথুরে বাড়ি, ভেতরে ধুলো আর কালির ঝাঁঝালো গন্ধ। জানালার কাছের উঁচু টেবিলে বসে ছিল রোগা, চশমা-পরা এক করণিক, যার আঙুলগুলো সারাক্ষণ কাঁপে। লুকাস নিজের নাম বলতেই লোকটা চোখ নামিয়ে নিল, যেন আগেই জানত সে আসবে।
"আমি দিয়েগো মোরেনোর ঋণের দলিলটা দেখতে চাই।"
করণিক অনিচ্ছায় একটা মোটা খাতা টেনে এনে একটা পাতা খুলে দিল। লুকাস ঝুঁকে পড়ল। চারশো রুপোর মুদ্রার ঋণ, কোনো এক বাণিজ্য-ঘরের নামে, আর নিচে বাবার সই।
কিন্তু লুকাসের চোখ আটকে গেল সইয়ের ওপর। বাবার "দ"-এর মাথায় সবসময় একটা ছোট্ট ফাঁস থাকত, যেটা এই সইয়ে নেই। কেউ নকল করেছে, ভালোভাবে, কিন্তু অভ্যাসটা নকল করতে পারেনি।
"এটা জাল," সে নিচু গলায় বলল। "আমার বাবার সই এমন ছিল না।"
করণিকের ঘাড় ঘেমে উঠল। "আমি... আমি শুধু খাতা রাখি, বাবা। আইন বলে, ঋণ প্রমাণিত হলে দশ দিনের মধ্যে শোধ না হলে জাহাজ নিলামে উঠবে। জাল প্রমাণ করতে মাসের পর মাস লেগে যায়, আদালতে, দূরের শহরে।" সে গলা আরও নামাল। "আর এই কাগজ... ওপর থেকে এসেছে। আমাকে ছোঁয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি।"
ওপর থেকে। কোন ওপর? কার হুকুমে একটা মৃত মানুষের নামে এমন নিখুঁত জাল দলিল তৈরি হয়, আর বন্দর-দপ্তরের করণিক পর্যন্ত তা ছুঁতে ভয় পায়? লুকাস বুঝল, এখানে আর কিছু পাওয়ার নেই। সে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল, আর সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে হিসাব কষল। চারশো মুদ্রা। দশ দিন। আর সম্বল প্রায় শূন্য।
দ্বিতীয় দিন। সে মাকে সব খুলে বলতে পারেনি, কিন্তু মা নিজেই এগিয়ে এলেন। সন্ধ্যায় রান্নাঘরের টেবিলে তিনি একটা পুরনো কাপড়ের পুঁটলি খুলে রাখলেন। ভেতরে রুপোর একটা ছোট্ট ব্রোচ, ফুলের নকশা কাটা, বহু বছরের পুরনো।
"এটা তোর বাবা আমাকে বিয়ের দিন দিয়েছিল," তিনি বললেন, তাঁর গলা অদ্ভুতভাবে শান্ত। "সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। কিন্তু তোর বাবার জাহাজের চেয়ে বড় না। বিক্রি করে দে।"
লুকাসের গলা বন্ধ হয়ে এল। "মা, না। আমি অন্য উপায়..."
"আমি বলছি, নিয়ে যা।" মা তার হাতে ব্রোচটা গুঁজে দিলেন, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সেই রাতে লুকাস অনেকক্ষণ ধরে তার ঠান্ডা, ছোট্ট ওজন হাতে নিয়ে বসে থাকল।
সেই রাতে বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, আর জানালার কাচে ফোঁটাগুলো আঁকাবাঁকা রেখা টানছিল। লুকাস ঘুমোতে পারেনি। বারবার তার মনে হচ্ছিল, এই ব্রোচটা মায়ের আঙুলের মতো, শেষ যে জিনিসটা তাঁর কাছে আছে বাবার স্মৃতির।
তৃতীয় দিন। স্বর্ণকারের দোকানে ব্রোচটা বিক্রি হলো সত্তর মুদ্রায়, যা সে আশা করেছিল তার চেয়ে অনেক কম। বাড়ি ফেরার পথে সে রান্নাঘরের তামার হাঁড়ি-কড়াইয়ের জন্য আরও ত্রিশ মুদ্রা জোগাড় করল। একশো। চারশোর এক-চতুর্থাংশ।
চতুর্থ দিন। এবার পথ দেখাল তোমাস। সে সারা সকাল ঘুরে ঘুরে জেলেপাড়ার প্রতিটা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি কথা বলে এসেছে। সন্ধ্যায় সে লুকাসের হাতে একটা ভারী থলে ধরিয়ে দিল। "ওরা কেউ বেশি দিতে পারেনি, কিন্তু সবাই কিছু না কিছু দিয়েছে। দিয়েগোকে সবাই চিনত।" থলেতে চল্লিশ মুদ্রা, আর তার নিচে তামার পয়সা, ঝিনুকের মালা, এমনকি একটা ছোট্ট ছুরিও। প্রতিটা জিনিস একটা ছোট্ট দান।
লুকাস কিছু বলতে পারল না। তোমাসকে কেবল জড়িয়ে ধরল। সন্দেহের সেই কাঁটাটা, গির্জার দিনের সেই কাঁটাটা, এই মুহূর্তে বড় লজ্জাকর মনে হলো।
পঞ্চম দিন। ভোরের কুয়াশা তখনও সরেনি, সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে, আর সমুদ্র ধূসর থেকে সোনালি হচ্ছে। সে ঘাটে কুলির কাজ নিল, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বস্তা টানল, মাছের ঝুড়ি বইল, কাঁধ আর পিঠ ব্যথায় ভেঙে পড়ল। মজুরি পঁচিশ মুদ্রা। হাতের তালুতে ফোসকা পড়ে ফেটে গেল, কাঁধের ওপর দড়ির দাগ বসে গেল। প্রতিটা বস্তা তোলার সময় সে ভাবছিল, বাবাও এভাবেই একদিন এই ঘাটে কাজ শুরু করেছিলেন, এই একই পাথরে পা রেখে। প্রতিটা তামার পয়সা সে দাঁতে চেপে গুনল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে লক্ষ্য করছিল, ঘাটের শেষ প্রান্তে এস্তেলা নেগ্রার ডেকে নতুন একটা প্রহরী, আর সরাইখানার সামনে ধূসর আলখাল্লার এক ছায়া, যে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। লুকাস মাথা নিচু করে কাজ করে গেল, যেন কিছুই দেখেনি।
ষষ্ঠ দিন। এস্তেবান এল তার ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে, লাঠিতে ভর দিয়ে, কাঁধে একটা পুরনো চামড়ার থলে। বুড়োর চোখ লাল।
"এটা আমি চল্লিশ বছর ধরে জমিয়েছি," সে বলল, থলেটা লুকাসের হাতে রেখে। "নিজের কবরের খরচের জন্য। দিয়েগোকে আমি একবার ফিরিয়ে দিয়েছি, ছেলে। এবার আর পারব না।"
লুকাস কাঁপা হাতে থলে খুলল। পঁয়তাল্লিশ রুপোর মুদ্রা, সবকটাই পুরনো, ক্ষয়ে যাওয়া, বহু হাত ঘুরে আসা। সে প্রতিবাদ করতে গেল, কিন্তু বুড়ো তার মুখের ওপর হাত রাখল। "না। এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত। নিতে দাও।"
সেদিন সন্ধ্যায় ফেলিপাও এল, মাছের ঝুড়ি কাঁধে, আর কোনো কথা না বলে চল্লিশটা মুদ্রা গুঁজে দিয়ে চলে গেল।
সপ্তম দিন সন্ধ্যায় লুকাস রান্নাঘরের টেবিলে সব মুদ্রা ঢেলে গুনল। মোমের আলোয় রুপো আর তামার স্তূপ চকচক করছিল। মা পাশে বসে, এলেনা হঠাৎ এসে একটা ছোট্ট মাটির ভাঁড় তার সামনে রাখল। "দাদা, আমারটাও নাও।" ভেতরে তিনটা তামার পয়সা। এলেনার ভাঙা জুতোর দিকে তাকিয়ে লুকাসের চোখ জ্বলে উঠল। সে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরল, আর একটা কথাও বলতে পারল না।
গোনা শেষ হলো। দুশো পঞ্চাশ। দুশো পঞ্চাশ মুদ্রা, সাত দিনের শ্রম, ভালোবাসা আর ত্যাগের ফসল।
চারশো থেকে এখনও দেড়শো কম। আর নিলামের বাকি মাত্র তিন দিন।
লুকাস টেবিলের ওপর মাথা নুইয়ে বসে রইল। বাইরে হাওয়া ঠান্ডা হয়ে উঠেছে, সমুদ্রের গর্জন গভীর। সে বুঝতে পারছিল না, আর কী করা যায়। সমস্ত দরজা সে কড়া নেড়েছে। যাদের কাছে চাইতে পারত, সবার কাছে চেয়েছে।
ঠিক তখনই সদর দরজার বাইরে কিছু একটা ভারী জিনিস মাটিতে পড়ার শব্দ হলো।
লুকাস লাফিয়ে উঠে দরজা খুলল। গলি অন্ধকার, খালি। কেউ নেই। শুধু দরজার চৌকাঠের কাছে পড়ে আছে একটা চামড়ার থলে, মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধা।
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে থলেটা তুলে নিল। ভারী। সে রান্নাঘরে ফিরে এসে টেবিলের ওপর সেটা উপুড় করল।
রুপোর মুদ্রা ঝনঝন করে ছড়িয়ে পড়ল। নতুন, চকচকে, ভারী, মসৃণ কিনারা। সবকটা একই ছাঁচের।
লুকাসের শরীর হিম হয়ে এল। মা অস্ফুট শব্দ করে মুখে হাত চাপা দিলেন।
সে এক এক করে গুনল। কাঁপা আঙুলে, নিঃশব্দে। একশো আটচল্লিশ, একশো উনপঞ্চাশ... একশো পঞ্চাশ।
ঠিক একশো পঞ্চাশ। ঠিক ততটা, যতটা কম পড়ছিল।
সে থলেটা তুলে ভেতরে হাত চালাল, চিঠি বা কোনো চিরকুট খুঁজল। কিছুই নেই। শুধু চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে একটা ক্ষীণ, মিষ্টি গন্ধ। লবঙ্গ।
মা ধীরে ধীরে ফিসফিস করলেন, "লুকাস, এই টাকা ফিরিয়ে দে। এতে ভালো কিছুর গন্ধ নেই।" লুকাস উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানত, মা ঠিকই বলছেন। কিন্তু সে এও জানত, বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর। আর মাত্র তিন দিন।
লুকাসের মনে হলো, ঘরের ভেতরের বাতাস হঠাৎ জমে গেছে। কেউ তার ঘরের টাকার হিসাব জানে। কেউ তাকে দেখছে, গুনছে, মেপে মেপে ঠিক সেটুকুই পাঠিয়েছে, যেটুকু দরকার।
ওকে খেলতে দাও।
আর সে এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে এই টাকা না নিলে জাহাজ চিরকালের জন্য চলে যাবে, আর নিলে সে চিরকালের জন্য ওদের হাতে বাঁধা পড়ে যাবে।
