![]() |
| Image: Ai Generated |
সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে লুকাস গিয়ে দাঁড়াল উত্তরের পুরনো জেটিতে।
জায়গাটা শহরের অন্য প্রান্তে, মূল ঘাটের কোলাহল থেকে অনেক দূরে। বহু বছর আগে এটা ছিল মালবাহী জাহাজের ঘাঁটি, এখন শুধু শ্যাওলা-ধরা কাঠের পাটাতন, ভাঙা খুঁটি আর নোনা বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া দড়ির টুকরো। জোয়ারের পানি খুঁটির গায়ে গা ঘষে ছলছল শব্দ করছিল। পশ্চিমের আকাশে সূর্য ডুবছে, লালচে কমলা আলো ঢেউয়ের মাথায় ছড়িয়ে পড়ছে, আর পুরো সমুদ্রটাই যেন আগুনে গলানো তামার মতো ঝিলমিল করছিল।
এখানে আসার পথে সে বারবার পেছনে ফিরে তাকিয়েছে, প্রতিটা গলির মোড়ে থেমে কান পেতেছে। কেউ নেই, তবু বুকের ভেতরের অস্বস্তি কাটেনি। বাজারের সেই রুপোর মুদ্রাটা, ফেলিপার কাঁপা আঙুল, তোমাসের ভয়ার্ত চোখ, সবকিছু তার মাথায় এক জট পাকিয়ে রেখেছিল, আর সে ঠিক করেছিল, কথার ওপর ভরসা না করে নিজের চোখে দেখবে।
তোমাসের কথাটা লুকাসের মাথায় ঘুরছিল। লণ্ঠন ছাড়া অন্ধকারে, কাঠের বাক্স আর লম্বা বান্ডিল। সে চোখ নামিয়ে জেটির পাটাতন পরীক্ষা করতে শুরু করল।
বেশি সময় লাগল না। জেটির শেষ প্রান্ত থেকে ডাঙার দিকে কাদামাটির ওপর দুটো গভীর খাঁজ চলে গেছে, ভারী চাকার দাগ। কেউ একটা বোঝাই গাড়ি টেনে নিয়ে গেছে, আর বৃষ্টির পরও দাগগুলো এখনও স্পষ্ট। কিছুটা দূরে, একটা আধভাঙা খুঁটির গোড়ায় পড়ে ছিল কয়েক গোছা শুকনো খড়, যেটা কোনো বাক্সের প্যাকিংয়ে ব্যবহার হয়। লুকাস হাঁটু গেড়ে বসে খড়ের গোছাটা তুলে নিল। আলকাতরার তীব্র গন্ধ। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট্ট একটা কাঠের টুকরো আটকে ছিল, ছাল-ওঠা, নতুন ভাঙা।
বাবার জাহাজ থেকে এসব নামানো হয়েছিল, এতে আর সন্দেহ রইল না।
লুকাস খড়ের গোছা পকেটে ভরে উঠে দাঁড়াল। তখনই বুঝতে পারল, সে একা নয়।
জেটির কাঠের পাটাতনের ওপর এক জোড়া পায়ের শব্দ, ধীর, নিশ্চিত, ঠিক যেন কেউ আগেই জানত সে এখানে আসবে। লুকাস ঘুরে দাঁড়াল।
পশ্চিমের শেষ আলোর বিপরীতে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। লম্বা, রোগাটে, ধূসর ভ্রমণ-আলখাল্লায় মোড়া, মাথায় টানা হুড। মুখের অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা, শুধু ঠোঁটের কোণে একটা শান্ত, প্রায় সৌজন্যপূর্ণ হাসির আভাস। হাতে দস্তানা। আর বাতাসে ভেসে এল লবঙ্গের মৃদু, মিষ্টি গন্ধ, এই বন্দরের মাছ আর আলকাতরার গন্ধের মধ্যে একেবারেই বেমানান।
"সন্ধ্যার সমুদ্র সুন্দর, তাই না?" লোকটা বলল। তার কণ্ঠ নরম, ধীর, আর উচ্চারণে এমন একটা টান, যা এই শহরের কারও নয়। "অনেকে মনে করে, যা সুন্দর তা নিরাপদও।"
"আপনি কে?"
"একজন পথিক। সমুদ্রের ধারে হাঁটা আমার অভ্যাস।" লোকটা এক পা এগোল। "আর তুমি দিয়েগোর ছেলে, তাই না? লুকাস।"
লুকাসের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। এই লোকটা তার নাম জানে, তার বাবার নাম জানে। অথচ সে একে আগে কখনও দেখেনি।
"আমি এখানে বেড়াতে এসেছি," সে সংযত গলায় বলল।
"অবশ্যই।" লোকটার হাসিটা আরও একটু প্রসারিত হলো। "তোমার বয়সে আমিও এভাবে সন্ধ্যায় হেঁটে বেড়াতাম। শোকের পর মানুষের পা নিজে থেকেই অদ্ভুত সব জায়গায় নিয়ে যায়।"
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু জোয়ারের পানি খুঁটির গায়ে বাড়ি খাচ্ছিল। তারপর লোকটা এমনভাবে বলল, যেন আবহাওয়ার কথা বলছে:
"ফেলিপার মাছ খুব তাজা, শুনেছি। তবে তার জিভ বড় বেশি আলগা। বয়সের সাথে সাথে মানুষের মুখ ঢিলে হয়ে যায়, বন্দরে এটা বিপজ্জনক।"
লুকাসের শরীর শক্ত হয়ে গেল। আজ সকালে ফেলিপার ছাউনিতে বসে থাকার কথা কেউ জানার কথা নয়। কিন্তু এই লোকটা জানে। তার মানে, সে সারাদিন তাকে অনুসরণ করেছে।
"আপনি কী বলতে চান?"
"কিছুই না। আমি শুধু একটা পরামর্শ দিচ্ছি।" লোকটা ধীরে ধীরে হুডটা সামান্য পেছনে সরাল। তার মুখটা এবার আংশিক দেখা গেল। বয়স আন্দাজ করা কঠিন, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। চোখ দুটো ধূসর, ঠান্ডা, আর আশ্চর্যরকম স্থির। "বন্দরে আজকাল বেশি প্রশ্ন করা স্বাস্থ্যকর নয়, লুকাস। শোকের পর মানুষ বাড়ি যায়, মায়ের পাশে বসে, আস্তে আস্তে ভুলে যায়। এটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। তোমার ছোট বোনের বয়স আট, তাই না?"
লুকাসের রক্ত হিম হয়ে গেল।
"এলেনার কথা তুলবেন না," সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, আর নিজের কণ্ঠের কাঁপুনিটা সে চেপে রাখতে পারল না।
"আমি শুধু ভালো জিনিসের কথা বলছি।" লোকটা দুই হাত খুলে দেখাল, যেন সে নিরীহ। "আমি তোমাকে হুমকি দিচ্ছি না, ছেলে। আমি তোমার শত্রু নই। তবে বন্ধুও নই। আমি শুধু এমন একজন, যে চায় না তুমি এমন কিছুতে জড়িয়ে পড়ো, যা তোমার চেয়ে অনেক বড়।"
লুকাস লোকটার প্রতিটা খুঁটিনাটি মনে গেঁথে নিতে চাইল। দস্তানা-পরা হাত, ধূসর আলখাল্লার কিনারায় লেগে থাকা সামান্য কাদা, চলার ভঙ্গিতে সতর্ক নিঃশব্দতা, যেন সে অনেক বছর ধরে এমন কাজই করে আসছে, যেখানে পায়ের শব্দও প্রমাণ হয়ে যায়। এই লোক সাধারণ পথিক নয়, তা বুঝতে তার একমুহূর্তও লাগল না।
লুকাসের মাথা ঘুরছিল। রাগ, ভয়, অসহায়তা, সবকিছু একসাথে তার বুকে ফুঁসে উঠছিল। সে ইচ্ছে করল লোকটার কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলে, তার বাবার কী হয়েছিল। কিন্তু বাবার চিঠির প্রতিটা শব্দ তাকে থামিয়ে রাখল। কাউকে কিছু বোলো না।
"আমার কিছু বলার নেই," সে বলল, যতটা সম্ভব স্থির গলায়।
"চমৎকার।" লোকটা মাথা সামান্য নুইয়ে বিদায় জানানোর ভঙ্গি করল, তারপর ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক পা গিয়ে থমকে দাঁড়াল, না ঘুরেই বলল:
"আর একটা কথা। তোমার গলার সুতোটা জামার ভেতরে গুঁজে রেখো। শহরে চোখের অভাব নেই।"
তারপর সে ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আবছা আলোয় মিলিয়ে গেল, পেছনে শুধু লবঙ্গের ক্ষীণ গন্ধ ফেলে রেখে।
লুকাস স্থির দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার দ্রুত নামছিল। সমুদ্রের লাল আভা মিলিয়ে গিয়ে এখন শুধু কালচে নীল পানি, আর দূরে মূল ঘাটের লণ্ঠনগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, ছোট ছোট সোনালি বিন্দুর মতো। বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে এল, আর জেটির খুঁটিগুলোর ফাঁক দিয়ে ঢেউয়ের আওয়াজ এমন শোনাল, যেন কেউ নিচু গলায় ফিসফিস করছে।
তার মনের ভেতর একটাই ছবি ঘুরছিল: ছোট্ট এলেনা, মাটি ছুঁতে না পারা পা দুটো বেঞ্চ থেকে ঝুলছে। লোকটা বোনের বয়স জানে। কীভাবে? আর কতটা জানে?
হাত নিজের অজান্তেই বুকের দিকে গেল। জামার নিচে সুতোটা ঠিকই আছে, চাবিটা তার বুকের ওপর ঠান্ডা আর ভারী হয়ে ঝুলছে। কিন্তু সুতোটা তো জামার ভেতরেই ছিল। বাইরে থেকে দেখার কোনো উপায় নেই।
তাহলে লোকটা জানল কীভাবে?
সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল গির্জার সেই দিনটা। টিলার কিনারা, এস্তেবানের কাঁপা হাত, তালুতে চেপে দেওয়া পিতলের চাবি। আর পেছনে, গির্জার দরজার ছায়ায়, সেই নিশ্চল কালো অবয়ব, যে তাকিয়ে ছিল সরাসরি তার মুঠোর দিকে।
লুকাসের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে এল। তাহলে ওটা কোনো ভুল ছিল না। কেউ দেখেছিল। কেউ জানে।
আর সে এইমাত্র তার সাথে কথা বলেছে।
ফেরার পথে লুকাস সবচেয়ে অন্ধকার, সবচেয়ে সরু গলিগুলো এড়িয়ে গেল, বারবার পেছনে তাকাল, প্রতিটা ছায়াকে সন্দেহ করল। বাড়ির দরজায় পৌঁছে সে অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, গভীর শ্বাস নিয়ে মুখের ভাব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ভেতরে মা আর এলেনা অপেক্ষা করছে। আজ রাতে সে তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারবে কিনা, জানত না।
দরজা খুলতেই এলেনা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল, আর তার মুখ ঝলমল করছিল। "দাদা, জানো? আজ একজন খুব ভালো মানুষ আমাকে মিষ্টি দিয়েছে!" সে মুঠো খুলে দেখাল। তার ছোট্ট হাতের তালুতে একটা সোনালি রঙের লজেন্স।
লুকাস নিচু হয়ে সেটার ঘ্রাণ নিল। তারপর তার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল।
লবঙ্গের মিষ্টি, পরিচিত গন্ধ।
