![]() |
| Image: Ai Generated |
পোর্তো ভেলিয়োর সকালের বাজার ছিল শহরের হৃৎস্পন্দন। পাথর বাঁধানো চত্বরের চারপাশে সারি সারি ছাউনি, কোথাও রংচঙে কাপড় ঝুলছে, কোথাও রুপোলি মাছ স্তূপ করে সাজানো, কোথাও মশলার ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস ভারী। কামারের হাতুড়ির ঠকঠক, মুরগির কক কক, শিশুদের ছোটাছুটি আর দরদামের চিৎকার মিলেমিশে এক বিশাল কোলাহল তৈরি করেছে। ভেজা পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে মেঘলা আকাশের টুকরো টুকরো ছায়া কাঁপছিল। লুকাস সেই ভিড়ের মধ্যে ধীরে ধীরে হাঁটছিল, কাঁধ সামান্য ঝুঁকিয়ে, কান খাড়া করে।
সে জানত, বন্দর শহরে কোনো খবর চুপচাপ থাকে না। একটা জাহাজ ভেড়ে, একজন মানুষ ফেরে না, আর তিন দিনের মধ্যে প্রতিটা গলি নিজের মতো করে একটা গল্প বানিয়ে ফেলে। সে ঠিক করেছিল, আজ সে শুধু শুনবে, কিছু বলবে না। সত্যটা হয়তো গুজবের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে, শুধু তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
প্রথম গল্পটা সে শুনল রুটির দোকানের সামনে, দুজন মহিলার ফিসফিসানিতে।
"শুনেছ? দিয়েগো নাকি এক গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছিল। সেই লোভেই সবাই তার পিছু নিয়েছিল।"
"আহা রে। লোভ বড় খারাপ জিনিস।"
কিছুটা এগোতেই কাপড়ের ছাউনির পাশে আরেকটা সুর, এবার ভয় মেশানো। একজন বুড়ো তাঁতি নিচু গলায় বলছিল, "ওই সমুদ্রের ওপারে একটা অভিশপ্ত জায়গা আছে, বুঝলে। যে ওখানে যায়, সে আর ফেরে না। দিয়েগো নিশ্চয়ই ভুল করে সেদিকে চলে গিয়েছিল।"
তৃতীয়টা এল কসাইয়ের দোকানের কাছে, কয়েকজন তরুণের হাসিঠাট্টার ফাঁকে। "আরে, ওর তো বিশাল ধার ছিল। ধার শোধ করতে না পেরে পালিয়ে গেছে, আর ক্যাপ্টেন গল্প বানিয়েছে ঝড়ের।"
লুকাসের মুঠো আপনাআপনি শক্ত হয়ে গেল। ইচ্ছে হলো ছেলেটার কলার চেপে ধরে বলে, তার বাবা কোনোদিন কারও এক পয়সা ধার রাখেননি। কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে সামনে এগিয়ে গেল। নিজের বাবার নামে এমন কথা শোনা, আর চুপ করে থাকা, এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। অথচ সে জানত, একবার রেগে উঠলে সবাই তাকে লক্ষ্য করবে, আর এখন লক্ষ্য হওয়াটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
চতুর্থ গল্প, পঞ্চম গল্প। কেউ বলল, দিয়েগো ক্যাপ্টেনের সাথে ঝগড়া করেছিল। কেউ বলল, জাহাজে অন্য একজন মহিলা ছিল। কেউ বলল, সমুদ্রের কোনো দানব তাকে টেনে নিয়েছে। প্রতিটা গল্প আগেরটার সম্পূর্ণ উল্টো, আর প্রতিটা বলার সময় বক্তার চোখে এক ধরনের উত্তেজিত আনন্দ, যেন অন্যের মৃত্যুও তাদের একঘেয়ে দিনে একটু রং ছড়াচ্ছে।
চত্বরের মাঝখানের পুরনো ফোয়ারার ধারে এসে লুকাস থামল। ক্লান্তিতে তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। এত গল্প, অথচ কোনোটাই একে অপরের সাথে মেলে না। তার মানে একটাই। কেউ কিছু জানে না, সবাই শুধু অন্যের মুখ থেকে শুনে আরেকজনকে বলছে। বা, কেউ কেউ জানে, আর তারাই নীরব।
তখনই একটা কর্কশ গলা তার পেছন থেকে ডেকে উঠল।
"দিয়েগোর ছেলে না? এদিকে আয়, বাবা।"
ঘুরে তাকিয়ে লুকাস দেখল, ফোয়ারার পাশের মাছের ছাউনিতে বসে আছে ফেলিপা, মাছ-বিক্রেতা বুড়ি, যার বয়স কত তা কেউ জানে না। তার চুল ধবধবে সাদা, হাত দুটো নোনা আর আঁশের গন্ধে মাখা, কিন্তু চোখ দুটো এখনও পাখির মতো তীক্ষ্ণ। ছোটবেলায় লুকাস মায়ের সাথে বাজারে এলে এই বুড়ি তাকে চুপিচুপি একটা শুকনো মাছ ধরিয়ে দিত।
ছাউনির নিচে ছায়া আর বরফের ঠান্ডা, চারপাশে কাঠের গামলায় তখনও নড়ছে সদ্য ধরা মাছ, তাদের আঁশে সকালের আলো পিছলে যাচ্ছিল। লুকাস কাছে যেতেই বুড়ি হাতের ছুরি নামিয়ে রাখল, আর এমনভাবে তাকাল যেন সে একজন কিশোরকে নয়, একজন বড় মানুষকে দেখছে।
"বোস," ফেলিপা নিজের পাশের টুলটা দেখাল। "তোর বাবার জন্য আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে। ও ছিল এই শহরের সবচেয়ে ভালো মানুষগুলোর একজন।"
লুকাস চুপচাপ বসল। "লোকজন নানা কথা বলছে, খালা। কোনটা সত্যি, বুঝতে পারছি না।"
ফেলিপা মাছের ঝুড়ির ওপর ঝুঁকে এল। তার গলা নেমে এল ফিসফিসে। "শহরের লোক জানে না, আমি জানি। কারণ মাছের বাজারে সব খবর আগে আসে, বাবা। শোন। জাহাজটা যখন গেল, ক্রু ছিল এগারোজন। আমার ভাইপো দড়ি টেনেছিল ওই জাহাজে, নিজের চোখে গুনেছে। আর ফেরার দিন যারা নামল, তারা সাতজন।"
লুকাসের নিঃশ্বাস আটকে গেল। "সাতজন?"
"সাতজন। তাহলে বাকি চারজন? তোর বাবা, আর আরও তিনজন। ক্যাপ্টেন বলছে ওরা ঝড়ে গেছে। কিন্তু আমি তিন দিন ধরে বাজারে বসে আছি, কান পেতে শুনছি। দিয়েগোর জন্য শোকসভা হলো। আর বাকি তিনজনের? কেউ কাঁদল না, কোনো পরিবার এল না, গির্জার দেয়ালে নতুন নাম উঠল না।"
লুকাস ধীরে ধীরে মাথা তুলল। গির্জার সেই দিনটা তার মনে পড়ল। সত্যিই তো। সে শুধু বাবার জন্য কেঁদেছে, শুধু বাবার জন্য সমবেদনা নিয়েছে। আর কারও নাম সে শোনেনি।
"ওরা বাইরের লোক ছিল, খালা?"
লুকাসের মনে হলো, চারপাশের কোলাহল হঠাৎ দূরে সরে গেছে। চারজন মানুষ হারিয়ে গেছে, অথচ একজনের জন্য শহর কেঁদেছে আর বাকি তিনজন যেন কখনও ছিলই না। এই অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা তাকে পীড়া দিচ্ছিল, ঠিক যেমন কোনো বাদ্যযন্ত্রের একটা তার ঢিলে হয়ে গেলে পুরো সুরটাই বেসুরো লাগে।
"হয়তো। দূরের কোনো বন্দর থেকে ভাড়া করা। যাদের কেউ নেই, তাদের জন্য কেউ কাঁদেও না, কেউ প্রশ্নও করে না।" বুড়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "কিন্তু আমি বলি কী, বাবা, সংখ্যাটা কথা বলে। মানুষ মিথ্যে বলে, সংখ্যা মিথ্যে বলে না।"
লুকাস ধন্যবাদ জানিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, তখন ফেলিপা তার হাত চেপে ধরল। বুড়ির আঙুলগুলো কাঁপছিল।
"আর একটা কথা। যারা ফিরেছে, ওই সাতজন। প্রথম দিন সকালেই ওরা শহরের সব ধার শোধ করে দিয়েছে। মদের দোকান, কসাই, কাপড়ওয়ালা, সবাইকে নগদ রুপোর মুদ্রায়। নতুন, চকচকে, সব একই ছাঁচের। আমি নিজে একটা পেয়েছি।"
সে কোমরের থলি থেকে একটা মুদ্রা বের করে লুকাসের হাতের তালুতে রাখল। ওজনে ভারী, কিনারা মসৃণ, ছাপ একদম নতুন। এমন মুদ্রা লুকাস আগে কখনও দেখেনি। এই বন্দরের কোনো টাকশালে এগুলো তৈরি হয় না।
"ওরা এত টাকা কোথায় পেল, খালা?"
বুড়ি তার চোখের দিকে সোজা তাকাল। "সেটাই তো আমিও ভাবছি, বাবা। ঝড়ে সবকিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষ এক রাতে এত ধনী হয় কীভাবে?"
লুকাস মুদ্রাটা ফিরিয়ে দিল, কিন্তু তার মনে হলো তার হাতে এখনও তার ছাপ লেগে আছে। তার ভেতরে রাগ আর তিক্ততা একসাথে ঘনিয়ে এল। বাবার মৃত্যুর পর তাদের ঘরে এক পয়সাও আসেনি, মা এখনও হিসাব করে করে রান্নার তেল ঢালেন। অথচ যারা সেই একই জাহাজে ছিল, তারা এক রাতে রুপোয় ভেসে গেছে। এই অন্যায়টা তার গলা পর্যন্ত উঠে এসে আটকে রইল। বাজারের কোলাহল তার কানে আর পৌঁছাচ্ছিল না। সবকিছু এখন একটাই ছবিতে জুড়ে যাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে লুকানো বাক্স, হারিয়ে যাওয়া লগবই, বাকি তিন নাবিক যাদের জন্য কেউ কাঁদেনি, আর এই নতুন রুপোর মুদ্রা।
সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল মানচিত্রের সেই ছেঁড়া কোণটার কথা, যার কিনারা ছিল ফ্যাকাশে, সাদা, তাজা। কেউ কি সেই অংশটা সরিয়েছে? আর সেই কেউ কি এই রুপোর মালিকদেরই একজন? প্রশ্নগুলো ভেতরে ভেতরে কাঁটার মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু উত্তর কোথাও নেই, শুধু একটা ঠান্ডা অনুভূতি, যেন সে এক বিশাল জালের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, যার সুতো কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সে জানে না।
বাবার মৃত্যুর পর কেউ নীরবতা কিনে নিয়েছে। আর সেই নীরবতার দাম মিটিয়ে দিয়েছে এমন কেউ, যার কাছে রুপোর অভাব নেই।
