শেষ কারাভেল || অধ্যায় ৫: সন্দেহের শুরু

Image: Ai Generated

ভোরের প্রথম আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে রান্নাঘরের মেঝেতে সরু ফালি হয়ে পড়েছিল, আর লুকাস তখনও জেগে। সারা রাত সে এক মুহূর্তও চোখ বোজেনি। সিন্দুকটা সে আবার তালা দিয়ে আগের জায়গায়, দড়ির গোছার নিচে রেখে এসেছে। মানচিত্র আর খাতাগুলো লুকিয়েছে চুলার পেছনের দেয়ালের একটা আলগা পাথরের গর্তে, যেখানে ছোটবেলায় সে নিজের ঝিনুকের সংগ্রহ লুকিয়ে রাখত। পিতলের চাবিটা এখন একটা সুতোয় বাঁধা, তার জামার নিচে বুকের কাছে ঝুলছে, ঠান্ডা আর ভারী।

মা উঠে এসে চুলায় কাঠ ঠেলতে ঠেলতে তার মুখের দিকে তাকালেন। "তুই ঘুমোসনি, লুকাস?"

"ঘুম আসছিল না, মা।"

কথাটা মিথ্যে ছিল না, তবু পুরোটা সত্যও ছিল না। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে এই প্রথম বুঝল, সত্য আধখানা করে বলা কতটা যন্ত্রণার। মা কিছু না বলে তার সামনে এক বাটি গরম দুধ রাখলেন, আর সেই নীরব যত্নটুকু লুকাসের বুকে একটা অপরাধবোধের পাথর হয়ে বসল।

সে ঠিক করল, আজ সে নিজের চোখে দেখবে। বাবার মৃত্যু সত্যিই এক সাধারণ ঝড়ের ফল কিনা, সেটা জানার একটাই জায়গা আছে: বন্দর।

পোর্তো ভেলিয়োর ঘাট সকালবেলা জেগে ওঠে ধীরে ধীরে। কুয়াশা তখনও পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে, সাদা চাদরের মতো। দড়িদড়া ক্যাঁচক্যাঁচ করে কাঁদছে, গাঁঠরির ওপর সী-গাল পাখিরা চেঁচিয়ে ঝগড়া করছে, আর বাতাসে ভেসে আসছে তাজা মাছ আর আলকাতরার তীব্র গন্ধ। লুকাস পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল, চোখ খুঁজছিল শুধু একটা জিনিসকে।

ওই তো। ঘাটের শেষ প্রান্তে, অন্য জাহাজগুলো থেকে একটু আলাদা হয়ে, দাঁড়িয়ে আছে বাবার জাহাজ। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল তার দুর্দশা। মাস্তুলের একটা অংশ ভাঙা, পালে বড় বড় তালি, আর কাঠামোর পাশে লম্বা এক ক্ষতচিহ্ন। ডেকের ওপর একজন লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে, হাতে লাঠি, চোখ বন্দরের দিকে। প্রহরী। একটা ভাঙা জাহাজকে কেন কেউ পাহারা দেয়?

লুকাসের মনে পড়ল, বাবা আকাশের দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারতেন, কোন রাতে ঝড় আসবে আর কোন রাতে সমুদ্র ঘুমিয়ে থাকবে। হাওয়ার গন্ধ, পাখিদের উড়ানের ভঙ্গি, ঢেউয়ের রং, সবকিছু ছিল তাঁর পাঠ্যবই। এমন মানুষ একটা সাধারণ ঝড়ের মুখে অসহায়ভাবে হারিয়ে গেলেন, কথাটা ভাবতেই তার ভেতরে কোথাও একটা সুর বেসুরো বেজে উঠল।

প্রশ্নটা মনে আসতেই লুকাস টের পেল, তার ভেতরে কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত সে ছিল শুধু একজন শোকার্ত ছেলে। আজ সে প্রশ্ন করতে শিখছে।

"লুকাস!"

পেছন থেকে ডাক শুনে সে ঘুরে তাকাল। পাথরের ধাপে বসে জাল সারাচ্ছিল তোমাস, তার পুরনো বন্ধু। গতকাল গির্জায় ঠিক এই ছেলেটাই তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। যারা তোমার দুঃখে সবচেয়ে বেশি কাঁদবে... বাবার সেই বাক্য লুকাসের মাথায় এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল। সে নিজেকে ধমক দিল। তোমাস তার ছোটবেলার বন্ধু। তবু তার পা সাবধানে এগোল।

"এত সকালে এখানে?" তোমাস জিজ্ঞেস করল, জালের গিঁট থেকে চোখ না তুলেই।

"ঘুম আসছিল না।" লুকাস পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ দুজনে চুপ করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে খুব সাবধানে, যেন পাতলা বরফের ওপর হাঁটছে, বলল, "তোমাস, বাবার জাহাজ যেদিন ফিরল, তুই কি ঘাটে ছিলি?"

তোমাসের আঙুল জালের ওপর থেমে গেল।

"ছিলাম," সে নিচু গলায় বলল। "মাছ ধরে ফিরছিলাম রাতের শেষে। কিন্তু... লুকাস, তোকে আমার বলার কথা না।"

"কী বলার কথা না?"

তোমাস চারপাশে একবার তাকাল, তারপর আরও ফিসফিস করে বলল, "জাহাজটা প্রথমে মূল ঘাটে ভেড়েনি। ওটা আগে ঢুকেছিল উত্তরের পুরনো জেটিতে, যেখানে এখন কেউ যায় না। আমি আমার নৌকা থেকে দেখেছি। তিন-চারজন লোক লণ্ঠন ছাড়া অন্ধকারে নেমে এল, হাতে কয়েকটা কাঠের বাক্স আর লম্বা একটা বান্ডিল। ওরা সেগুলো একটা গাড়িতে তুলল। তারপর ভোর হওয়ার আগেই জাহাজ ঘুরে মূল ঘাটে এসে ভিড়ল, যেন কিছুই হয়নি।"

লুকাসের শরীর শক্ত হয়ে গেল। "কী ছিল বাক্সগুলোয়?"

"জানি না। কিন্তু একটা কথা, লুকাস।" তোমাস এবার সোজা তার চোখের দিকে তাকাল, আর সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিল, খাঁটি ভয়। "সকালে সবাই বলছিল, ঝড়ে ওদের সব হারিয়ে গেছে, রসদ, মালপত্র, সব। অথচ আমি নিজের চোখে দেখেছি, ওরা কিছু একটা লুকিয়ে সরিয়ে নিল। আমি কাউকে বলিনি। ভয় পেয়েছিলাম।"

লুকাস নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। পানির ওপর কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল, আর দূরে বাবার জাহাজের ভাঙা মাস্তুলটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, যেন কোনো আহত পশুর কঙ্কাল। বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো কিছু একটা বাজছিল। তোমাস কি সত্যিই বন্ধু, নাকি ঠিক এই কথাগুলো বলাই তার কাজ? সে জানত না। কিন্তু তোমাসের কাঁপা হাত আর ভেজা চোখ কোনো অভিনয়ের মতো লাগল না। অন্তত আজ নয়।

"ধন্যবাদ," সে বলল। "আর কাউকে বলিস না।"

"আমি বলব না।"

লুকাস উঠে দাঁড়াল। তার মাথায় এখন আরেকটা জিনিস ঘুরছিল, যেটা মায়ের মুখে সে আগেও শুনেছে, কিন্তু আজ প্রথম বুঝল তার ওজন। বাড়ি ফিরে সে সোজা রান্নাঘরে গেল, যেখানে মা আটা মাখছিলেন।

"মা, ক্যাপ্টেন কি বাবার জিনিসপত্র কিছু পাঠিয়েছে? তাঁর লগবই, কাপড়, যন্ত্রপাতি?"

মায়ের হাত থেমে গেল। "না। ক্যাপ্টেনের একজন লোক এসেছিল প্রথম দিন। বলল, ঝড়ে দিয়েগোর সব জিনিস সমুদ্রে চলে গেছে। কিছুই ফেরেনি।"

লুকাসের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

বাবা জীবনে কোনোদিন লগবই ছাড়া জাহাজে পা রাখেননি। সেটা তাঁর হাতের মুঠো, তাঁর ধর্ম। আর জাহাজটা নিজেই ফিরে এসেছে, ভাঙা, তবু ভাসমান। কেবিনের ভেতরের একটা চামড়ার খাতা, একটা বাক্স, সামান্য কিছু কাপড়, সেগুলো কোন ঝড়ে হারায়, যে ঝড় জাহাজটাকেই ডোবাতে পারেনি?

মিথ্যে। কেউ মিথ্যে বলছে।

সে বিকেলে আর কোনো কথা না বলে বাড়ির বাইরে বেরোল, কোথায় যাবে তা না জেনেই, শুধু মাথাটা পরিষ্কার করতে। আকাশে তখন ধূসর মেঘ ভেঙে ভেঙে ভেসে যাচ্ছিল, আর সূর্যের শেষ আলো ঢেউয়ের মাথায় তামার পাতের মতো জ্বলছিল। সমুদ্রের ধারের সরু পথটা পাথুরে, দুপাশে নোনা বাতাসে নুয়ে পড়া ঝোপঝাড়। হাঁটতে হাঁটতে লুকাস নিজেকেই জিজ্ঞেস করছিল, সে এখন কী করবে? সবকিছু ভুলে গিয়ে মা আর এলেনার জন্য একটা সাধারণ জীবন বেছে নেবে? নাকি এই সুতো ধরে টানতে টানতে এমন জায়গায় পৌঁছাবে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না? একটা বাঁকে এসে সে থমকে গেল।

এস্তেবান দাঁড়িয়ে ছিল সামনে, লাঠিতে ভর দিয়ে, যেন অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে।

"চাবিটা কি কাজে এসেছে, ছেলে?"

লুকাসের গলা কেঁপে যাওয়ার আগেই সে নিজেকে সামলে নিল। বাবার চিঠির প্রতিটা শব্দ তার কানে বাজছিল। "না," সে বলল, স্থির কণ্ঠে। "সিন্দুকে তেমন কিছু পাইনি। পুরনো কাগজ।"

এস্তেবান কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। বুড়োর ঘোলাটে চোখে একটা অদ্ভুত আলো ঝিলিক দিল, যা বিশ্বাসের নয়, অবিশ্বাসেরও নয়। তারপর সে আস্তে করে বলল, "ভালো। তাহলে যা-ই পেয়ে থাকো, যা-ই পাবে, কাউকে দেখাবে না। যে-ই চাইবে, তাকে দেবে না।"

সে এক পা এগিয়ে এসে আরও নিচু গলায় যোগ করল:

"আমাকেও না।"

বুড়ো ধীরে ধীরে মোড় ঘুরে চলে গেল। লুকাস সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, হাওয়ায় তার জামা ফুলে উঠছিল। বাবার চিঠিতেও ঠিক এই কথাই ছিল, "তাকেও পুরোপুরি বিশ্বাস কোরো না।" দুটো কথা এক সুরে বাজছিল, আর লুকাসের মনে হলো, এই বন্দর শহরে এখন একজনও মানুষ নেই, যাকে সে সত্যিই বিশ্বাস করতে পারে।
Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!