শেষ কারাভেল || অধ্যায় ৪: অসম্পূর্ণ মানচিত্র

Image: Ai Generated

কতক্ষণ সে কাগজটা হাতে নিয়ে বসে ছিল, লুকাস নিজেও জানে না। মোমবাতির শিখা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছিল, গলে যাওয়া মোম টপটপ করে টেবিলের কিনারা বেয়ে নিচে ঝরছিল। বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছে। প্রথমে সামান্য ফোঁটা, তারপর একটানা ঝমঝম শব্দে ছাদের খড়ের ওপর আছড়ে পড়া জলের স্রোত। কুঠুরির ভেতরের বাতাস ঠান্ডা আর ভেজা, তবু লুকাসের কপালে ঘাম জমছিল।

"যারা তোমার দুঃখে সবচেয়ে বেশি কাঁদবে, তাদের ওপর নজর রেখো।"

বাবার এই বাক্যটা তার মাথায় ঘুরছিল চাকার মতো, আর প্রতিবার ঘুরে এসে একই প্রশ্নে ঠেকছিল। কে? এস্তেবান? সেই ক্লান্ত ক্যাপ্টেন? নাকি তোমাস, যে আজ সকালে তাকে এত লম্বা সময় জড়িয়ে ধরে রেখেছিল? কিন্তু লুকাস নিজেকে থামাল। সন্দেহ একবার মনে ঢুকলে তা বিষের মতো ছড়ায়, আর এই মুহূর্তে সে সবাইকেই সন্দেহ করতে শুরু করলে সত্যিকারের শত্রুকে চেনার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলবে। এখন তার দরকার প্রমাণ, অনুমান নয়।

আর তবু, সব সন্দেহের মাঝখানেও একটা আশ্চর্য অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরছিল। বাবা তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। এত গোপন, এত বিপজ্জনক কিছু, যা নিজের স্ত্রীকেও জানাননি, সেটা তিনি রেখে গেছেন তার জন্য। যে ছেলেটা শেষ রাতে তাঁর মুখের ওপর বলেছিল, "আমি আর পারব না", তার ওপরই বাবা ভরসা করেছিলেন। এই ভাবনাটা একই সাথে সান্ত্বনা আর চাবুকের মতো লাগল তার কাছে।

বাইরে ঝড়ো হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে মোমের শিখাটাকে বারবার কাত করে দিচ্ছিল। দূরের সমুদ্র থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের গর্জন এখন আরও গভীর, আরও ভারী শোনাচ্ছে, যেন নিচের অন্ধকার জলের ভেতর কিছু একটা পাশ ফিরে শুচ্ছে। লুকাসের হঠাৎ মনে হলো, সমুদ্র যেন জানে সে আজ রাতে কী খুলতে চলেছে।

সে সিন্দুকের ভেতরে হাত বাড়াল। সবার নিচে সেই লম্বাটে বান্ডিলটা, মোম মাখানো তেলকাপড়ে মোড়া, দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। তুলতেই বোঝা গেল এটা যতটা ভারী দেখাচ্ছিল, ততটা নয়। বরং এর ভেতরের জিনিসটা যেন কোনো ভঙ্গুর প্রাণীর মতো সাবধানে লুকিয়ে রাখা।

দড়ির গিঁটটা ছিল জটিল, নাবিকদের নিজস্ব গিঁট, যেটা লুকাস ছোটবেলা বাবার কাছেই শিখেছিল। আঙুলগুলো নিজে থেকেই পথ খুঁজে নিল। একটা পাক খুলল, তারপর আরেকটা। দড়ি আলগা হতেই তেলকাপড়ের ভাঁজ খুলে গেল, আর ভেতর থেকে উঠে এল শুকনো চামড়া আর পুরনো কালির গন্ধ।

ভেতরে ছিল একটা মানচিত্র।

লুকাস সাবধানে সেটা টেবিলের ওপর বিছিয়ে দিল। কোণগুলো আটকে দিল পিতলের দোয়াত, মোমদানি, আর দুটো পুরনো বইয়ের ভারে। মানচিত্রটা এঁকে রাখা হয়েছে ভেড়ার চামড়ায়, কিনারাগুলো হলদেটে, ভাঁজের জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে। কালিটা বহু বছরের পুরনো, তবু কিছু কিছু রেখা আশ্চর্যরকম স্পষ্ট, যেন কেউ বারবার সেগুলোর ওপর নতুন করে কলম বুলিয়েছে।

বাঁ দিকে লুকাস তার নিজের উপকূলকে চিনতে পারল। পোর্তো ভেলিয়োর খাঁড়ি, দক্ষিণের পাথুরে অন্তরীপ, উত্তরের বালুচর। এই অংশটুকু সে আগেও বন্দরের দপ্তরের দেয়ালে ঝোলানো নৌ-মানচিত্রে দেখেছে। কিন্তু তার ডান দিকে, যেখানে সাধারণ মানচিত্রগুলো শেষ হয়ে যায়, সেখানেই এই মানচিত্রের আসল গল্প শুরু হয়েছে।

প্রচলিত মানচিত্রে ওই জায়গাটায় আঁকা থাকে বিশাল সব সামুদ্রিক দানব আর লেখা থাকে "অজানা জলরাশি"। কিন্তু বাবার মানচিত্রে সেখানে কোনো দানব নেই। তার বদলে আছে একটা সরু, বাঁকানো বিন্দুর রেখা, যা উপকূল ছেড়ে সোজা পশ্চিমে এগিয়ে গেছে, তারপর হঠাৎ দক্ষিণে বেঁকে ঢুকে পড়েছে এমন এক অঞ্চলে, যেখানে আর কোনো নাবিক কখনও যায়নি। রেখাটার পাশে পাশে ছোট ছোট সংখ্যা, হয়তো জলের গভীরতা, আর কোণে কোণে ক্ষুদ্র তারার চিহ্ন, যেগুলোর পাশে অদ্ভুত সব সংকেত।

মানচিত্রের এক কোণে একটা ছোট্ট কম্পাস-গোলাপ আঁকা, আর তার পাশে পাখির ঝাঁকের সরু সরু আঁচড়। কয়েকটা জায়গায় ছোট ছোট ঢেউয়ের চিহ্নের নিচে লেখা "ঘূর্ণি", "অগভীর পাথর", "রাতে আলো দেখা গেছে"। শেষ কথাটা পড়ে লুকাসের ভুরু কুঁচকে গেল। মাঝসমুদ্রে আলো? কীসের আলো? কারা সেখানে থাকে?

সে চোখ বন্ধ করে ওই জায়গাটার কথা কল্পনা করার চেষ্টা করল। কেমন সেই সমুদ্র, যেখানে কোনো মানচিত্র পৌঁছায় না? সেখানে কি ঢেউগুলো আরও কালো, আরও উঁচু? সেখানে কি আকাশের রং অন্যরকম, রাতে তারাগুলো অচেনা? ছোটবেলায় নাবিকদের মুখে সে শুনেছিল, ওই সীমানার ওপারে পানি নাকি সোজা আকাশের কিনারায় গিয়ে ঝরে পড়ে। বাবা সেই গল্প শুনে হাসতেন, বলতেন, "সমুদ্র কখনও মিথ্যে বলে না, ছেলে। মিথ্যে বলে মানুষ।"

লুকাসের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। রেখাটা কোনো কল্পনার নয়। প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা গভীরতার সংখ্যা এত নিখুঁত যে বোঝা যায়, কেউ নিজের চোখে এই পথ পেরিয়েছে, আর পেরিয়েছে একবার নয়, অনেকবার।

বাবা... তুমি এই পথে গিয়েছিলে?

পথের শেষ মাথায়, যেখানে রেখাটা এসে থেমেছে, সেখানে আঁকা সাতটা ছোট বিন্দু, একটা অর্ধবৃত্তের মতো সাজানো। কোনো নাম নেই, কোনো পরিচয় নেই, শুধু একটা বিন্দুর ওপর সেই পরিচিত চিহ্নটা, সিন্দুকের ঢাকনার সেই তারা, যার মাঝখান দিয়ে একটা রেখা নেমে গেছে। আর তার নিচে, বাবার সেই চিরচেনা হাতের লেখায়, ছোট অক্ষরে কয়েকটা শব্দ:

"পথ আছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। কিন্তু এখনও সবটা আঁকা হয়নি।"

লুকাস কাঁপা আঙুলে লেখাটার ওপর হাত বুলাল। কালিটা এখনও একটু উঁচু হয়ে আছে, যেন মাত্র কিছুদিন আগেই লেখা হয়েছে। বাবা যখন এই বাক্যটা লিখেছিলেন, তখন তাঁর মনে কী চলছিল? উত্তেজনা? ভয়? নাকি দুটোই একসাথে? সে কল্পনা করল, রাতের পর রাত এই কুঠুরিতে একা বসে বাবা এক এক ইঞ্চি করে এই পথ এঁকে চলেছেন, আর কাউকে বলার সাহস পাচ্ছেন না। একজন মানুষ কত বড় একটা গোপন বোঝা একা বইতে পারে?

লুকাসের গলার ভেতরটা শুকিয়ে এল। বাইরে বজ্র গর্জন করে উঠল, আর মুহূর্তের জন্য কুঠুরির জানালা সাদা আলোয় ভরে গেল। সেই আলোয় সে এই প্রথম খেয়াল করল, মানচিত্রটা অসম্পূর্ণ।

পথের রেখাটা সাত বিন্দুর দ্বীপপুঞ্জে এসে থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু মানচিত্রের নিচের ডান কোণটা নেই। কেউ সেটা ছিঁড়ে নিয়েছে। ছেঁড়া কিনারাটা এবড়োখেবড়ো, আর সেখানে এমন কিছু অংশ কাটা পড়েছে যেখানে নিশ্চয়ই আরও কিছু আঁকা ছিল। হয়তো দ্বীপগুলোর নাম, হয়তো পৌঁছানোর সংকেত, হয়তো পুরো রহস্যের চাবিকাঠি।

সে মোমবাতিটা কাছে টেনে আনল। শিখার আলোয় ছেঁড়া কিনারাটা পরীক্ষা করতে গিয়েই তার শরীর হিম হয়ে গেল।

বাকি মানচিত্রের কিনারাগুলো বহু পুরনো, বাদামি, ক্ষয়ে যাওয়া। কিন্তু ছেঁড়া অংশের কিনারাটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানকার চামড়ার রং ফ্যাকাশে, প্রায় সাদা, যেন বাতাস আর সময় এখনও সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। ছেঁড়াটা পুরনো নয়। বড়জোর কয়েক সপ্তাহের।

তাড়াতাড়ি সে সিন্দুকের খাতাগুলো আবার তুলে নিল। শেষের ছেঁড়া পাতাগুলোর কিনারায় তাকাল। একই ফ্যাকাশে রং। একই রকম তাজা ক্ষত।

লুকাসের হৃৎপিণ্ড ধক ধক করে লাফিয়ে উঠল। বাবা কি যাত্রার ঠিক আগে নিজেই এগুলো ছিঁড়ে সরিয়ে ফেলেছিলেন, কোনো কারণে সবটা এক জায়গায় রাখতে চাননি? নাকি অন্য কেউ?

সে মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল। একদিকে এই পথ, যা তাকে ডাকছে, বাবার না-বলা কথার মতো। অন্যদিকে ঘুমন্ত বাড়ি, মা আর এলেনা, যাদের এই পৃথিবীতে এখন সে-ই একমাত্র পুরুষ। যদি সে এই পথে পা বাড়ায়, ওদের কে দেখবে? আর যদি না বাড়ায়, সারা জীবন কি বাবার মতো এই প্রশ্নটাই বয়ে বেড়াতে হবে? বুকের ভেতর দুটো টান একসাথে তাকে দুদিকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইল।

কিন্তু তার আগে, একটা প্রশ্নের উত্তর তার জানা দরকার।

সিন্দুকের তালা ছিল বন্ধ। চাবিটা ছিল এস্তেবানের কাছে।

কিন্তু একটা চাবি কি একটাই থাকে?
Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!