![]() |
| Image: Ai Generated |
লুকাস বিছানায় যায়নি। সে বসে ছিল রান্নাঘরের অন্ধকারে, মুঠোর ভেতর এস্তেবানের দেওয়া পিতলের চাবিটা চেপে ধরে। জং-ধরা ধাতুটা তার হাতের তালুতে ঠান্ডা, ভারী। বুড়োর কথাগুলো কানে বাজছিল: "সিন্দুক খোলার আগে নিশ্চিত হয়ো, কেউ তোমাকে দেখছে না।" গির্জার দরজায় দাঁড়ানো সেই কালো অবয়বটা এখনও তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, যে এক পলকে মিলিয়ে গিয়েছিল।
সে অপেক্ষা করল। প্রতিটা মিনিট মনে হচ্ছিল এক ঘণ্টা। মায়ের ঘর থেকে যখন আর কোনো শব্দ এল না, আর এলেনার ছোট নিঃশ্বাসও গভীর ছন্দে নেমে এল, তখন সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। জানালাগুলো একে একে পরীক্ষা করল, দরজার খিল টেনে দেখল, এমনকি একবার ফাঁক দিয়ে বাইরের গলিতে উঁকি দিল। ভেজা পাথরের ওপর শুধু একটা রোগা বিড়াল পাঁচিল বেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আর কেউ নেই।
তবু তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি থামল না।
বাইরে আকাশ আরও ভারী হয়ে উঠেছিল। দূর দিগন্তে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, নিঃশব্দে, যেন সমুদ্র নিজের মনে কোনো গোপন কথা আওড়াচ্ছে। হাওয়ার ঝাপটায় জানালার কাঠের পাল্লা মাঝে মাঝে মৃদু শব্দে কেঁপে উঠছিল। লুকাসের মনে হলো, গোটা শহরটাই আজ রাতে শ্বাস চেপে অপেক্ষা করছে, আর সে এমন কিছুর দিকে এগোচ্ছে, যার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত নয়।
মোমবাতি হাতে সে পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনের সেই ছোট কুঠুরির দিকে এগোল। কুঠুরিটা ছিল বাবার নিজস্ব জগৎ, সরু আর নিচু ছাদের, যেখানে সমুদ্রের গন্ধ যেন চিরকালের জন্য আটকে আছে। ছোটবেলায় বাবা এটাকে হেসে বলতেন "নাবিকের গুহা"। দেয়ালে ঝোলানো মরচে-ধরা সেক্সট্যান্ট, দড়ির গোছা, তাকে হলুদ হয়ে যাওয়া বই। আর সামনের দেয়ালের একটা জায়গায়, যেখানে বাবার কম্পাসটা ঝুলত, সেখানে এখন শুধু একটা ফ্যাকাশে গোল দাগ। কম্পাসটা এখন মাটির নিচে, বাবার শূন্য কফিনে।
লুকাসের গলা শুকিয়ে এল। এই কুঠুরিতে কত সন্ধ্যা সে বাবার পাশে বসে কাটিয়েছে। বাবা মোমের আলোয় কাগজে দাগ কাটতেন, আর মাঝে মাঝে মাথা তুলে হেসে বলতেন, "দেখো, লুকাস, সমুদ্রও একটা বইয়ের মতো। শুধু পড়তে জানতে হয়।" আজ সেই একই ঘরে বাবার চেয়ারটা শূন্য, আর তার ওপর পড়ে থাকা ধুলোর পাতলা আস্তরণ বলে দিচ্ছিল, কত দিন কেউ এখানে আসেনি। সে মোমবাতিটা টেবিলে রাখল।
সিন্দুকটা ছিল কুঠুরির কোণে, দড়ির গোছার নিচে। ছোট, কিন্তু ভারী। গাঢ় ওক কাঠের তৈরি, কোণগুলো লোহার পাতে মোড়া, সামনে বিশাল একটা তালা। ঢাকনায় খোদাই করা একটা তারার চিহ্ন, যার মাঝখান দিয়ে একটা রেখা নেমে গেছে। লুকাস ছোটবেলা থেকেই এটাকে দেখে আসছে, আর ছোটবেলা থেকেই জানে এটা ছোঁয়া নিষেধ। একবার, দশ বছর বয়সে, সে ঢাকনায় হাত দিয়েছিল। বাবা পেছন থেকে তার কবজি ধরে ফেলেছিলেন, রাগে নয়, এক অদ্ভুত ভয়মেশানো কোমলতায়। "এটা ছুঁয়ো না, লুকাস। সময় হলে আমি নিজেই বলব।"
সেই সময় আর আসেনি।
লুকাস ভাবল, মাকে ডেকে আনবে কিনা। মা এই সিন্দুকের কথা কখনও কিছু বলেননি। হয়তো তিনি জানতেনই না ভেতরে কী আছে। কিন্তু এস্তেবানের নিষেধ তাকে থামিয়ে দিল। "তোমার মাকেও না।" কেন? মাকে কেন বলা যাবে না? প্রশ্নটা তার মনে একটা অস্বস্তিকর ছায়া ফেলল। নিজের মায়ের কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে রাখা, বিশেষ করে আজকের মতো দিনে, তার কাছে প্রায় বিশ্বাসঘাতকতার মতো লাগছিল। কিন্তু বাবার জন্য, বাবার শেষ ইচ্ছার জন্য, সে নিজের সঙ্গেই এক নীরব সমঝোতায় এল।
লুকাস সিন্দুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আর তখনই, সম্পূর্ণ অনাহূতভাবে, যাত্রার আগের রাতটা তার মনে ফিরে এল। রান্নাঘরের টেবিল, মোমের আলো, বাবার সামনে ভাঁজ করা কাগজ। "এবার আমার সাথে চলো, লুকাস। তোমাকে এমন কিছু দেখাতে চাই, যা কোনো বইয়ে নেই।" আর সে মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, সে ক্লান্ত, সে আর দিগন্তের পেছনে ছুটতে পারবে না।
বাবা কী দেখাতে চেয়েছিলেন, এখন সে বুঝল। কথাটা বুকে গিয়ে ছুরির মতো বিঁধল। যা দেখাতে চেয়েছিলেন, তা এই সিন্দুকেই ছিল। অথচ সে শোনেইনি।
"আমি দুঃখিত, বাবা," সে ফিসফিস করে বলল। তারপর পিতলের চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘোরাল।
প্রথমে কিছুই হলো না। জং-ধরা কলকব্জা আটকে রইল। লুকাস দাঁতে দাঁত চেপে আরেকটু জোর দিল। তারপর ভারী, গভীর এক ক্লিক শব্দে তালা খুলে গেল। কুঠুরির নীরবতায় শব্দটা বজ্রপাতের মতো শোনাল। লুকাস নিঃশ্বাস বন্ধ করে দরজার দিকে তাকাল। কোনো পায়ের আওয়াজ নেই। শুধু বাইরে বাতাস, আর সমুদ্র।
সে ধীরে ধীরে ঢাকনা তুলল।
ভেতর থেকে ভেসে এল পুরনো কাগজ, তেল আর নোনা পানির মিশ্র গন্ধ, ঠিক বাবার গায়ের গন্ধের মতো। ভেতরে সবকিছু সযত্নে সাজানো। ওপরে ভাঁজ করা একটা নৌ-কম্বল। তার নিচে চামড়ায় বাঁধা কয়েকটা খাতা, কিনারাগুলো নোনা বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া। আর সবার নিচে, মোম মাখানো তেলকাপড়ে জড়ানো লম্বাটে একটা বান্ডিল, দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা।
লুকাসের আঙুল কাঁপছিল। সে একটা খাতা তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাল। পাতাগুলো ভরা ছিল সরু সরু হাতের লেখায়, সমুদ্রের গভীরতা, তারার অবস্থান, বাতাসের দিক, আর কোণে কোণে আঁকা অদ্ভুত সব রেখাচিত্র। শেষের কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে, কাগজের কিনারায় এখনও সেই ছেঁড়ার দাগ স্পষ্ট। কেউ কি তাড়াহুড়োয় ছিঁড়েছিল? নাকি বাবা নিজেই ইচ্ছে করে সরিয়ে রেখেছিলেন? সে খাতাটা আবার রেখে দিল, আর কম্বলটা সরাল।
আর তখনই দেখতে পেল, ঢাকনার ঠিক নিচে, সবকিছুর ওপরে, রাখা আছে একটা ভাঁজ করা কাগজ। কালো কালিতে তার ওপর লেখা একটাই শব্দ, বাবার চিরচেনা, তাড়াহুড়োয় আঁকা হাতের লেখায়:
"লুকাস।"
সে কাগজটা তুলে নিল। হাত এত কাঁপছিল যে ভাঁজ খুলতে দুবার চেষ্টা করতে হলো। মোমবাতির কেঁপে উঠা শিখায়, প্রথম লাইনটা পড়তেই তার সারা শরীর অবশ হয়ে এল।
"যদি তুমি এটা পড়ছ, তার মানে আমি আর ফিরিনি। সেদিন রাতে তোমাকে সবটা বলতে পারিনি, কারণ আমার নিজেরই ভয় ছিল তোমাকে এর ভেতরে টেনে আনার। কিন্তু এখন আর কোনো উপায় নেই। প্রথমে একটা প্রতিজ্ঞা করো, ছেলে। এ নিয়ে তুমি কাউকে কিছু বলবে না। তোমার মাকেও না।
আর যারা তোমার দুঃখে সবচেয়ে বেশি কাঁদবে, তাদের ওপর নজর রেখো।"
লুকাসের শ্বাস আটকে গেল। "যারা তোমার দুঃখে সবচেয়ে বেশি কাঁদবে।" আজ সকালেই তো গোটা বন্দর কেঁদেছে। প্রতিবেশী, নাবিক, ক্যাপ্টেন, সবাই। বাবা কাদের কথা বলছেন? কার চোখের জল মিথ্যে? কথাটা তার ভেতরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ল, আর এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, গির্জার ভিড়ের প্রতিটা মুখ এখন সন্দেহের মুখোশ পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে কাঁপা চোখে পরের লাইন পড়তে লাগলো।
"আর লুকাস, যে তোমাকে এই চাবিটা দিয়েছে, তাকেও পুরোপুরি বিশ্বাস কোরো না। আমি তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এখন আমি আর কারও ব্যাপারেই নিশ্চিত নই।"
লুকাস চাবিটার দিকে তাকাল, যা তখনও তালার গায়ে ঝুলছিল। এস্তেবানের কাঁপা হাত, তার ভয়ার্ত চোখ, "শুধু তোমাকে দিই, আর কাউকে নয়।" বুড়ো কি সত্যিই বাবার পক্ষে ছিল?
নাকি সে-ই ছিল সেই প্রথম মুখ, যে সবচেয়ে আগে লুকাসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল?
আরও পড়ুন:
