শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১৫: যাত্রার প্রাক্কালে


Image: Ai Generated


বারো দিন বারো মুহূর্তের মতো কেটে গেল।

উত্তরের বনের সবচেয়ে বড় আর সোজা পাইন গাছটা কেটে গরুর টানা গাড়িতে করে ঘাটে নিয়ে আসা হলো। ইগনাসিও আর তার দুই সঙ্গী দিনরাত করাত আর বাটালি চালিয়ে সেটাকে নতুন মাস্তুলে রূপ দিল। ওঠানোর দিন সকালে পুরো ঘাট জমে গেল দেখতে। মোটা দড়ি আর কপিকলের টানে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে বিশাল কাঠটা ধীরে ধীরে খাড়া হয়ে উঠল, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুঁটির গর্তে বসে গেল। লুকাস নিচে দাঁড়িয়ে দেখছিল, আর তার মনে হলো, এস্তেলা নেগ্রা যেন একটা ঘুমন্ত প্রাণী, যার মেরুদণ্ড আবার সোজা হচ্ছে।

খোলের ক্ষতগুলোতে আলকাতরা ঢালা হলো, তক্তা বদলানো হলো, ছেঁড়া পালগুলো তালি দিয়ে নতুন হয়ে উঠল। রুই ফন্তেস হিসাব রাখল খাবারের, শুকনো মাছ, নোনা মাংস, বিস্কুট, বাঁধাকপির পিপে, চল্লিশ দিনের মিঠা পানি, আর প্রতিটা পিপে সে নিজে গুনে গুনে ডেকের নিচে সাজাল। তার ক্ষিপ্রতা আর হাসিমুখ দেখে সবাই খুশি। মারিয়া নিজের যন্ত্রগুলো একটা একটা করে পরীক্ষা করল, কম্পাস মেলাল, তারার তালিকা আর সময়ের হিসাব নিয়ে ক্যাপ্টেনের কেবিনে বসে রাত জাগল। আর ভালদেজ প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রুদের নিয়ে ডেকে কাজ করাল, দড়ি, পাল, সংকেত, বিপদের মহড়া, যেন এক ছোট্ট বাহিনীকে তৈরি করছে।

লুকাসও খাটল, কাঁধে বস্তা, হাতে দড়ি, নিজের হাতের ফোসকা আবার ফেটে গেল। কিন্তু প্রতি রাতে, ডেকের একপাশে বসে, তার মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি জেগে উঠত। এত নির্বিঘ্ন কেন সব? ওলিভেরা একবারও ঘাটে আসেনি। ধূসর আলখাল্লার সেই মানুষটাকেও আর দেখা যায়নি। নিলামের জাল ঋণ নিয়ে কোনো নতুন হুমকি নেই, কেউ বাধা দিচ্ছে না, কেউ কিছু করছে না। এই নিস্তব্ধতাটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর।

বারো দিনের শেষ সন্ধ্যায় জাহাজ প্রস্তুত। পরদিন ভোরে ভাটার সাথে সাথে যাত্রা। সূর্যাস্তের আলোয় ভালদেজ সব ক্রুকে ডেকে জড়ো করল। এগারোজন মানুষ কাঠের পাটাতনে সারি বেঁধে দাঁড়াল, আর তাদের মুখের ওপর পড়ল লালচে আলো।

"শোনো," ভালদেজ গম্ভীর গলায় বলল। "আমরা কোথায় যাচ্ছি, সেটা তোমরা এখন জানবে না। তিন সপ্তাহ পর্যন্ত না। যার এতে আপত্তি, সে এখনই নেমে যাও। ভোরে আর সুযোগ থাকবে না।"

ক্রুদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল। কেউ ভুরু কোঁচকাল, কেউ মাথা চুলকাল। কেউ নামল না। রুই হেসে বলল, "ক্যাপ্টেন, আমি তো ভেবেছিলাম বলবেন কোথায় গেলে সোনা পাওয়া যায়। না জেনেই যাব, ভালোই হলো অন্তত বিস্ময়টা তো থাকবে।" ডেকে হালকা হাসির ঢেউ উঠল। লুকাস তাকিয়ে দেখল, ভালদেজের মুখে একটুও হাসি নেই, আর মারিয়া এক পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সবার মুখ পড়ছে। লুকাস ভালদেজের অনুমতি নিয়ে শেষ রাতটা বাড়িতে কাটাতে গেল।

বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়াল। এস্তেবান বসে ছিল দরজার সামনের পাথরে, লাঠির ওপর হাত রেখে, কোলে একটা কাপড়ের পুঁটলি। এলেনা তার পাশে বসে, চোখ বড় বড় করে।

"দাদা, দেখো!" সে লাফিয়ে উঠে পায়ের দিকে ইশারা করল।

লুকাস তাকিয়ে বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেলল। এলেনার পায়ে একজোড়া নতুন জুতো, নরম চামড়ার, ভেতরে পুরু ছেঁড়া-পালের আস্তর, সেলাই এত নিখুঁত যে চেনা যায় না হাতে তৈরি। ফেটে-যাওয়া সেই পুরনো জুতোর জায়গায় এখন এই অসাধারণ জোড়া।

"আমি নিজের হাতে বানিয়েছি," এস্তেবান লজ্জিত গলায় বলল, চোখ সরিয়ে। "জাহাজে থাকতে শিখেছিলাম। এ ছাড়া তোমার জন্য আমি আর কিছু করতে পারিনি, ছেলে।"

লুকাস কথা বলতে পারল না। সে কেবল বুড়োর কাঁধে হাত রেখে চেপে ধরল। এস্তেবানের হাত কাঁপছিল। রাতের খাবারের আগে, রান্নাঘরে মা যখন ব্যস্ত, সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল:

"ভালদেজ কি... সে-ই কি আপনার সেই তৃতীয়জন?"

এস্তেবান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রান্নাঘরের আগুনের আলো তার বুড়ো মুখে কাঁপা কাঁপা ছায়া ফেলছিল। শেষে সে মৃদু গলায় বলল, "হ্যাঁ। সে-ই ছিল। কিন্তু বাকি গল্প তার, আমার নয়। সে নিজে না বললে আমি বলব না।" সে একটু থামল। "তবে একটা কথা বলে রাখি, লুকাস। যা-ই শোনো, ওর সাথে ওর মুখে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ো না।"

লুকাস চমকে উঠল। এটা তো ভালদেজের চতুর্থ শর্তের কথাই। সে বুঝতে পারল, এই দুই বুড়ো মানুষ একে অপরকে যতটা চেনে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানে, শুধু বলছে না।

রাতের খাবার ছিল সাদামাটা, কিন্তু মা সারাদিন ধরে লুকাসের প্রিয় পদ রান্না করেছিলেন, ভাজা মাছ আর মশলা-মেশানো ভাত। সবাই চুপচাপ খেল। এলেনা বারবার নতুন জুতো দেখল, আর তোমাস দরজার বাইরে বসে পাহারার ভঙ্গিতে এমন মুখ করে ছিল যে হাসি আসছিল। খাওয়ার পর লুকাস দরজার বাইরে গিয়ে তোমাসের পাশে বসল। তোমাস চোখ না ফিরিয়েই বলল, "রোজ সন্ধ্যায় আমি উত্তরের জেটির দিকে নজর রাখব। ওখানে কিছু ঘটলে সবার আগে আমি জানব।" লুকাস কিছু বলল না, শুধু বন্ধুর কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। রাতের হাওয়ায় দুজনের মধ্যে এমন এক নীরব বোঝাপড়া ছিল, যা কোনো কথায় বলা যায় না।

তারপর মা লুকাসকে নিজের ঘরে ডাকলেন।

তিনি তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের থলে দিলেন, মুখ সুতোয় বাঁধা। ভেতরে মুঠোভর মাটি।

"আমাদের উঠোনের মাটি," মা বললেন। তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু চোখে জল ছিল না। "তোর বাবাকে এটা দিতে পারিনি। সে নিজেই বলেছিল, সমুদ্রে এর দরকার নেই। এখন বুঝি, দরকার ছিল।" তিনি লুকাসের মুঠো বন্ধ করে দিলেন। "এটা সাথে রাখিস। যেন পথ চিনে ফিরিস।"

লুকাসের বুক ভেঙে যাচ্ছিল। সে মায়ের কাছে সব বলে দিতে চাইল। চিঠি, মানচিত্র, আগন্তুক, বাবার মৃত্যুর পেছনের অন্ধকার। কিন্তু বাবার সেই চিঠির প্রতিটা শব্দ তাকে থামিয়ে দিল। সে শুধু মাকে জড়িয়ে ধরল, অনেকক্ষণ।

"আমি ফিরব, মা।"

"আমি জানি," মা বললেন। তারপর, খুব আস্তে, যেন নিজেকে শোনাচ্ছেন, "তোর বাবাও এটাই বলেছিল।"

সেই রাতে লুকাস ঘুমোতে পারল না। মাঝরাতের পর সে নিঃশব্দে উঠে, বোনের কপালে চুমু খেয়ে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। আজ শেষবার সে জাহাজটা একা দেখতে যাবে।

ঘাট নির্জন, শুধু চাঁদের আলো পানির ওপর রুপোর মতো ছড়িয়ে আছে। কুয়াশা নেই, ঢেউয়ের শব্দ নিচু, আর বাতাসে নোনা গন্ধের সাথে নতুন কাঠ আর আলকাতরার তাজা ঘ্রাণ। এই সেই ঘাট, যেখানে একদিন সে এক সাধারণ ছেলে হয়ে মায়ের জন্য মাছ কিনতে এসেছিল। আজ সেই একই ঘাটে সে দাঁড়িয়ে আছে, এক অজানা সমুদ্রের মুখোমুখি, বুকে বাবার চিঠি আর মায়ের দেওয়া মাটি। এস্তেলা নেগ্রা নতুন মাস্তুল নিয়ে কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে, ক্রুরা সবাই ঘুমে। লুকাস ডেকে উঠে রেলিং ধরে দাঁড়াল। সমুদ্র শান্ত, আকাশে মেঘ নেই, আর দূরে দিগন্তে কয়েকটা তারা ডুবে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই সে দেখল।

উত্তরের পুরনো জেটির শেষ প্রান্তে, অন্ধকারের মধ্যে, একটা ছোট্ট আলো জ্বলে উঠল। একবার। দুবার। তিনবার। কেউ একটা লণ্ঠন তুলে সংকেত দিচ্ছে, আর আলোর পাশে একটা লম্বা, রোগাটে ছায়া মূর্তি।

ছায়ামূর্তিটা এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল, তারপর লণ্ঠনটা নামিয়ে আনল। সে চেনে এই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, এই লম্বা, ধূসর আবছা অবয়ব। লবঙ্গের গন্ধ এতদূর থেকে আসার কথা নয়, তবু তার মনে হলো সে সেটা টের পাচ্ছে।

সে চোখ বড় করে তাকাল সমুদ্রের দিকে।

আর দিগন্তের কাছে, অনেক দূরে, কালো পানির ওপর, একটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠলো। একবার। দুবার। তিনবার।

সমুদ্রের ওপর একটা জাহাজ অপেক্ষা করছে।

আর লুকাস হঠাৎ বুঝল, কেন বারো দিন কেউ তাকে বাধা দেয়নি। ওরা তাকে আটকাতে চায়নি। ওরা তার পিছু নিতে চায়।


পরবর্তী পর্ব: চলবে,,,,,
Tags

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!