![]() |
| প্রতীকী ছবি: AI Generated |
আপনি এখন যে পানির বোতলটা হাতে নিয়ে আছেন, তার ভেতরেই থাকতে পারে হাজার হাজার অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা।আমরা প্রতিদিন যেসব সাধারণ জিনিস ব্যবহার করি, তার প্রায় প্রতিটার সঙ্গেই এখন জড়িয়ে আছে এই লুকানো সমস্যা।
নাম তার মাইক্রোপ্লাস্টিক। খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে আমাদের খাবারে, পানিতে, এমনকি ঘরের বাতাসেও। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বোতলজাত পানি ও প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, সেখানে এই বিষয়টা জেনে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা যেতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, প্রতিদিনের কোন কোন জিনিস থেকে এই ক্ষুদ্র কণা শরীরে প্রবেশ করছে, আর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এ নিয়ে ঠিক কী বলছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা। এর চেয়েও ক্ষুদ্র, ১ মাইক্রনের কম আকারের কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক, যা মানুষের চুলের চেয়েও বহুগুণ সরু।
বড় প্লাস্টিক পণ্য রোদ, তাপ ও ঘর্ষণে ভেঙে ভেঙে এসব কণায় পরিণত হয়। আবার কিছু কণা শুরু থেকেই এত ছোট আকারে তৈরি হয়। এই কণাগুলো এত সূক্ষ্ম যে সহজেই পানি, বাতাস বা খাবারের সঙ্গে মিশে শরীরে ঢুকে যেতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
প্লাস্টিকের বোতল ও বোতলের পানি
বোতলজাত পানি নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাগুলোর একটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।২০২৪ সালে এই গবেষকদল বিজ্ঞান সাময়িকী PNAS এ জানায়, প্রতি লিটার বোতলজাত পানিতে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার প্লাস্টিক কণা থাকতে পারে।
বিভিন্ন বোতলে এই সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ন্যানোপ্লাস্টিক। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো শরীরের বিভিন্ন জৈবিক বাধা পার হয়ে রক্তে ঢুকতে পারে কি না এবং তার স্বাস্থ্যগত প্রভাব ঠিক কী, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
গবেষণায় পাওয়া এই ন্যানোপ্লাস্টিক কণার একটা অংশ বোতল তৈরি, পানি ভরা বা পরিশোধন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে বলে গবেষকরা ধারণা করছেন, যদিও এর সঠিক উৎস নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তবে এই কণাগুলো ঠিক কতটা ক্ষতিকর, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান বলে গবেষকরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন।
প্লাস্টিকের খাবারের পাত্র ও ফুড প্যাকেজিং
গরম খাবার প্লাস্টিকের বাটিতে রাখা বা মাইক্রোওয়েভে গরম করা আমাদের প্রায় সবার নিত্যদিনের অভ্যাস।
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা-লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোওয়েভে মাত্র ৩ মিনিট গরম করলে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটার প্লাস্টিক পৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪২ লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ২১০ কোটি ন্যানোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হতে পারে।
এই পরীক্ষাটি মূলত শিশুখাদ্যের পাত্র নিয়ে চালানো হয়েছিল, যেগুলো পলিপ্রোপিলিন ও পলিইথিলিন দিয়ে তৈরি। শুধু গরম করাই নয়, ফ্রিজে বা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় মাসের পর মাস খাবার সংরক্ষণ করলেও লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি কণা নির্গত হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তাই গরম খাবার বা পানীয় প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা সিরামিকের পাত্রে রাখাটা তুলনামূলক নিরাপদ একটি অভ্যাস হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন।
সিন্থেটিক কাপড়
পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো সিন্থেটিক কাপড় এখন আমাদের আলমারির বড় একটা অংশ জুড়ে আছে। যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইতালির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াশিং মেশিনে এক বার ধোয়ার সময় প্রতি গ্রাম কাপড় থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার সুতার মতো ক্ষুদ্র ফাইবার বের হতে পারে।
শুধু ধোয়া নয়, স্রেফ ২০ মিনিট গায়ে পরে থাকলেই প্রতি গ্রাম কাপড় থেকে প্রায় ৪০০টি ফাইবার বাতাসে ছড়াতে পারে বলে একই গবেষণায় জানানো হয়েছে। হিসাব করে গবেষকরা বলছেন, একজন মানুষ শুধু কাপড় ধোয়ার মাধ্যমেই বছরে প্রায় ৩০ কোটি পলিয়েস্টার মাইক্রোফাইবার পরিবেশে ছেড়ে দিতে পারেন।
এই ফাইবারগুলো কাপড় ধোয়া পানির সঙ্গে গিয়ে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় মেশে, আর সেখান থেকে নদী-নালা ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
চায়ের ব্যাগ ও গরম পানীয়ের প্যাকেজিং
অনেকেই মনে করেন টি ব্যাগ মানেই কাগজ, কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের জালের মতো তৈরি একটি টি ব্যাগ ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে ভেজালে প্রায় ১১৬০ কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ৩১০ কোটি ন্যানোপ্লাস্টিক কণা এক কাপ চায়ে ছেড়ে দিতে পারে।
এই গবেষণাটি মূলত নাইলন বা PET দিয়ে তৈরি সিল্কি ধরনের প্রিমিয়াম টি ব্যাগ নিয়ে করা হয়েছিল, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে ব্যবহার হয়। কিছু কাগজের টি ব্যাগেও সিল করার জন্য সামান্য প্লাস্টিক পলিমার ব্যবহার করা হতে পারে, যদিও এই বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা সীমিত।
এই কণাগুলো মানবদেহে ঠিক কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান বলে গবেষকরা নিজেরাই জানিয়েছেন।
ঘরের ধুলা ও ইনডোর এয়ার
বাইরের বাতাসের চেয়ে ঘরের ভেতরের বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে, শুনতে অবাক লাগলেও ফ্রান্সের তুলুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা এমনটাই বলছে।
২০২৫ সালে PLOS ONE জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৮ হাজার অতি ক্ষুদ্র (১০ মাইক্রনের নিচে) মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিতে পারেন বলে গবেষকদের হিসাব। গাড়ির ভেতরের বাতাসে এই কণার পরিমাণ বাসার তুলনায় আরও বেশি পাওয়া গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
ঘরের বিভিন্ন সিন্থেটিক টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক সামগ্রী থেকে নির্গত কণা ঘরের ধুলা ও বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘরের ধুলা কম রাখা এবং ভালো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখলে যুক্তিসঙ্গতভাবেই এক্সপোজার কিছুটা কমতে পারে, তবে এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিগুলো ঠিক কতটা কার্যকর তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে শরীরকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখা আজকের দুনিয়ায় প্রায় অসম্ভব, কারণ এটা এখন পানি, খাবার, কাপড় আর বাতাস প্রায় সবখানেই মিশে আছে। তবে ছোট ছোট অভ্যাস বদলালে, যেমন গরম খাবার প্লাস্টিকে না রেখা বা কাচ বা স্টিলের পাত্র বেশি ব্যবহার করা, এতে এক্সপোজার কিছুটা কমানো সম্ভব বলে গবেষকরা মনে করেন।
মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাটাই এখন সবচেয়ে ভালো পথ।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মাইক্রোপ্লাস্টিক কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, তবে এটি ঠিক কতটা ক্ষতি করে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব কী, তা এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত নয় বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
প্লাস্টিকের বোতলের পানি খাওয়া কি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত?
শুধু প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া বন্ধ করাই সমাধান নয়, কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সবখানেই আছে বলে গবেষণাগুলো নির্দেশ করছে। তবে একই বোতল বারবার ব্যবহার বা রোদে রাখা এড়িয়ে চলা যেতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এক্সপোজার কমাতে সহজে কী করা যায়?
গরম খাবার-পানীয় প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টিলের পাত্রে রাখা, নিয়মিত ঘর পরিষ্কার করা এবং কাপড় ধোয়ার সময় অতিরিক্ত ঘর্ষণ কমানোর মতো অভ্যাসগুলো কিছুটা সাহায্য করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সোর্স:
Columbia University Mailman School of Public Health, PNAS গবেষণা (জানুয়ারি ২০২৪, প্রাইমারি সোর্স)
Environmental Science & Technology, University of Nebraska-Lincoln গবেষণা, ACS Publications (২০২৩, প্রাইমারি সোর্স)
University of Plymouth ও IPCB-CNR গবেষণা, ScienceDaily-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন (সেকেন্ডারি কভারেজ)
McGill University, Environmental Science & Technology গবেষণা (২০১৯, প্রাইমারি সোর্স)
Université de Toulouse গবেষণা, PLOS ONE (২০২৫, প্রাইমারি সোর্স)
