![]() |
| Image: Ai Generated |
পরদিন ভোরে নিলামের মঞ্চ ফাঁকা পড়ে রইল, আর ঘাটের নিয়োগ-চত্বরে ভিড় জমে উঠল।
পোর্তো ভেলিয়োর নাবিকেরা প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে এখানে এসে দাঁড়ায়, কাঁধে ঝোলা, চোখে আশা, যেন কোনো ক্যাপ্টেন এসে হাঁক দিয়ে বলে, "তোমাকে লাগবে।" আজ চত্বরে পঞ্চাশ-ষাটজন দাঁড়িয়ে। ভোরের কুয়াশা তখনও ঘাটের পাথরে জড়িয়ে আছে, বাতাসে আলকাতরা আর ভেজা দড়ির গন্ধ, আর দূরে মাছের নৌকাগুলো একে একে সমুদ্রে বেরোচ্ছে।
লুকাস আর ভালদেজ একটা পিপের ওপর উঠে দাঁড়াল। লুকাসের হাতে একটা নিয়োগের কাগজ, "আমার জাহাজ এস্তেলা নেগ্রার জন্য নাবিক চাই," সে গলা তুলে বলল। "ভালো মজুরি, আর ক্যাপ্টেন হেনরিক ভালদেজ।"
নামটা উচ্চারণ করতেই চত্বরের কোলাহল থেমে গেল। কয়েকজন মুখ ঘুরিয়ে নিল। কেউ কেউ সরাসরি পিছিয়ে গেল, যেন আগুনের তাপ লেগেছে। একজন বিড়বিড় করে বলল, "অভিশপ্ত জাহাজ।" আরেকজন থুতু ফেলে দিল। ওলিভেরার কথাই ঠিক হচ্ছে। এক-দুই করে মানুষ ভিড় ছেড়ে চলে যেতে লাগল, আর লুকাসের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে এল।
ঠিক তখনই ভিড়ের পেছনে এক বুড়ো গলা চেঁচিয়ে উঠল, ভাঙা, কর্কশ, কিন্তু অবিশ্বাস্য রকম উত্তেজিত।
"ক্যাপ্টেন ভালদেজ? সত্যি? ভগবান, তুমি বেঁচে আছ!"
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল এক টাক-মাথা, দৈত্যাকার মানুষ, যার কাঁধ দরজার মতো চওড়া আর হাত দুটো কাঠের গুঁড়ির মতো মোটা। তার চোখ ভিজে আছে। ভালদেজ পিপের ওপর থেকে নামল, আর দুজন একে অপরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন দশ বছরের দূরত্ব এক মুহূর্তে মুছে গেল।
"ইগনাসিও," ভালদেজ ফিসফিস করল। "বুড়ো ভাল্লুক।"
দেখতে দেখতে আরও চারজন এগিয়ে এল। কেউ খোঁড়া, কেউ এক চোখ-কানা, সবাই বয়সে ভারী, সবার চোখে সেই পুরনো আনুগত্য। বুড়ো হেলমম্যান দিনিস সবার আগে মাথা নত করে বলল, "ক্যাপ্টেন, আপনি যেখানে, আমরাও সেখানে।" লুকাস অবাক হয়ে দেখল, যে মানুষটাকে এই বন্দরের লোক ভুলে গেছে, তার জন্য পাঁচজন মানুষ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই জীবন বাজি রাখতে রাজি।
বাকিরা ভিড়ের মধ্যে ফিসফিস করছিল। কেউ কেউ ধীরে ধীরে চলে গেল। কিন্তু দুজন ভাইয়ের মতো দেখতে তরুণ এগিয়ে এল, ছেঁড়া জামা, শুকনো পেট, দূরের কোনো বন্দর থেকে আসা। "আমাদের কিছু নেই, স্যার," বড় ভাইটি বলল, তার নাম আন্দ্রে। "আমরা যাব।" ছোটজন, টিয়াগো, শুধু মাথা নাড়ল।
সাতজন। আরও দুজন বাকি।
"আমাকেও নিন।"
কণ্ঠটা পরিষ্কার, হাসিমাখা, আত্মবিশ্বাসে ভরা। ভিড় থেকে বেরিয়ে এল এক তিরিশ-বত্রিশ বছরের লম্বা, সুদর্শন যুবক, রোদে পোড়া মুখ, ছোট করে ছাঁটা গোঁফ, গলায় নীল রুমাল। তার চোখে এমন একটা সহজ উষ্ণতা, যা দেখেই মনে হয় সবাই তাকে বিশ্বাস করতে চাইবে।
"রুই ফন্তেস," সে হাত বাড়িয়ে বলল। "আমি এই বন্দরের লোক নই, কিন্তু সব বন্দরেই কাজ করেছি। শুনলাম কেউ আপনার সাথে যেতে চাইছে না।" সে হেসে বললো ভালো হয়েছে। ভিড় কম থাকলে কাজ বেশি হয়।"
লুকাস অনিচ্ছাসত্ত্বেও হেসে ফেলল। ভালদেজ শান্ত চোখে লোকটাকে মেপে নিল। "প্রথম পরীক্ষা। ওই মাস্তুলে উঠে দেখাও।"
রুই একটুও দ্বিধা না করে ঘাটের পাশে বাঁধা একটা জাহাজের মাস্তুলে উঠে গেল, বানরের মতো ক্ষিপ্র, তারপর দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে নেমে এল। সব পরীক্ষায় সে উতরে গেল: গিঁট, পাল, দড়ি, আবহাওয়ার আভাস। ভালদেজ কোনো মন্তব্য করল না, শুধু ঘাড় নেড়ে বলল, "প্রথম সঙ্গী হতে পারো, যদি লুকাস রাজি থাকে।"
লুকাস রাজি হলো। সে ভাবল, এমন একজন সহজ, দক্ষ মানুষ থাকলে ভয় কমে।
বাকি রইল শুধু একটা জায়গা, আর সূর্য তখন মাথার ওপর উঠে গেছে।
তখনই ঘাটের কোণ থেকে এক নরম, স্থির কণ্ঠ ভেসে এল। "নেভিগেটর লাগবে আপনাদের?"
সবাই ঘুরে তাকাল। দাঁড়িয়ে ছিল একজন সরু, মাঝারি উচ্চতার তরুণ, গায়ে ঢিলা কোট, মাথায় টুপি নামানো, কাঁধে ঝোলা। কিন্তু টুপির নিচ থেকে একগোছা কালো বিনুনি বেরিয়ে ছিল, আর কোটের ভেতর থেকে ঝলকে উঠছিল একটা পিতলের যন্ত্র।
"মেয়ে!" কেউ একজন হেসে উঠল। "সমুদ্রে মেয়ে?"
তরুণীর মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে টুপিটা খুলে ফেলল, আর লুকাস দেখল তীক্ষ্ণ, গাঢ় চোখ, শক্ত চোয়াল। "আমার নাম মারিয়া সান্তোস। আমার বাবা ছিলেন নেভিগেটর। আমি পাঁচ বছর বয়স থেকে তাঁর হাতে তারা চিনেছি।"
ভালদেজের ভুরু সামান্য উঠল। সে ইগনাসিওর দিকে তাকাল, ইগনাসিও কাঁধ ঝাঁকাল। ভালদেজ নিজের পকেট থেকে একটা সূর্য-যন্ত্র বের করে মারিয়ার হাতে দিল। "এখন, এই মুহূর্তে, আমরা কোন অক্ষাংশে, বলো।"
মারিয়া যন্ত্রটা উঁচু করে ধরল, চোখ কুঁচকে সূর্যের দিকে তাকাল, নিঃশব্দে কিছুক্ষণ হিসাব কষল। তারপর একটা সংখ্যা বলল, দ্রুত, পরিষ্কার। ভালদেজ নিজের যন্ত্রে মিলিয়ে দেখল। এক ডিগ্রির ভগ্নাংশ মাত্র তফাত।
"ভুল আছে," ভালদেজ বলল। "তোমার ভুল আমার ভুলের চেয়ে ছোট।"
ভিড় থেকে চাপা গুঞ্জন উঠল। মারিয়ার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
লুকাস তার দিকে একটু বেশিক্ষণ তাকিয়ে রইল। এই তরুণী কেন এখানে? কোন তাগিদে সে একটা অভিশপ্ত বলে ধরা জাহাজে, মেয়ে হয়েও, যেতে চায়? সে জিজ্ঞেস করতেই মারিয়া সোজা তার চোখের দিকে তাকাল।
"আমার নিজের কারণ আছে," সে বলল। "যথাসময়ে বলব।"
সেদিন বিকেলে ইগনাসিও এস্তেলা নেগ্রার ডেকে উঠে ভাঙা মাস্তুলের কিনারায় হাত বুলাল। অনেকক্ষণ সে কিছু বলল না, শুধু আঙুল দিয়ে সেই সূক্ষ্ম সমান্তরাল দাগগুলো ছুঁয়ে দেখল। তারপর ভালদেজের দিকে ঘুরে ভারী গলায় বলল, "এটা ঝড়ে ভাঙেনি, ক্যাপ্টেন। করাত।" ভালদেজ শুধু মাথা নাড়ল, যেন আগেই জানত। "নতুন মাস্তুল চাই, ইগনাসিও। আর বারো দিনের মধ্যে।" লুকাস নিঃশব্দে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝল, এই মানুষগুলোকে সত্য বোঝাতে তাকে কিছু বলতে হয় না।
সন্ধ্যার মধ্যে ক্রু পূর্ণ হলো। ভালদেজ, লুকাস, রুই, মারিয়া, ইগনাসিও, দিনিস, তিন পুরনো সঙ্গী, আর দুই ভাই আন্দ্রে ও টিয়াগো। সাদা কাগজে সবার নাম লেখা হলো। বন্দরের কুয়াশা আবার ঘনিয়ে আসছে, লণ্ঠনের আলো জ্বলছে, আর লুকাস মাস্তুলের ভাঙা অংশের নিচে দাঁড়িয়ে নতুন ক্রুর মুখগুলো একে একে দেখল।
ঠিক সেই সময় তোমাস দৌড়ে এল, হাঁপাতে হাঁপাতে। "আমাকেও নে, লুকাস। আমি যাব।"
লুকাস তার কাঁধে হাত রাখল। "না, তোমাস। তোকে এখানে লাগবে।" সে গলা নামাল। "মা আর এলেনার ওপর নজর রাখ। এস্তেবানকে সাথে নিস। আমি যাদের বিশ্বাস করি, তাদের বাঁচিয়ে রাখতে চাই।"
তোমাস অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে মাথা নাড়ল। "ঠিক আছে। আমি পাহারা দেব।"
রাতে, যখন সবাই চলে গেল, লুকাস ঘাটের ধারে একা দাঁড়িয়ে রইল। জোয়ারের জল ফিরে আসছে, খুঁটির গায়ে ধীরে ধীরে ছলাৎ ছলাৎ করে বাড়ি খাচ্ছে, আর আকাশে একে একে তারা ফুটছে। এই নতুন মুখগুলোকে সে মনে মনে একে একে ভাবল। ইগনাসিওর ভারী আনুগত্য, দিনিসের ক্লান্ত চোখ, দুই ভাইয়ের ক্ষুধা, রুইয়ের সহজ হাসি, মারিয়ার স্থির দৃষ্টি। এদের ওপর সে চল্লিশ দিনের জন্য নিজের জীবন তুলে দিচ্ছে। অথচ এদের কাউকে সে সত্যি চেনে না।
ভালদেজ একা তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার গলা নামানো।
"গুনে দেখেছ?"
লুকাস মাথা নাড়ল। "এগারোজন।"
"ঠিক। এগারোজন। ঠিক যতজন গিয়েছিল দিয়েগোর সাথে।" ভালদেজ চোখ সরিয়ে সমুদ্রের কালো অন্ধকারের দিকে তাকাল। "আর সাতজন ফিরেছিল।"
লুকাসের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
"ওরা তোমাকে খেলতে দিচ্ছে, মনে রেখো," ভালদেজ খুব নিচু গলায় বলল। "আর তাই এই এগারোজনের মধ্যে একজন, অন্তত একজন, ওদের লোক হবেই। আমরা শুধু জানি না কে।"
পূর্ববর্তী পর্ব: শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১৩: ভালদেজের শর্ত
পরবর্তী পর্ব: শেষ কারাভেল || অধ্যায় ১৫: যাত্রার প্রাক্কালে
