![]() |
| Image: Ai Generated |
অষ্টম দিনের ভোরে লুকাস ঘুম থেকে ওঠার আগেই ঠিক করে ফেলেছিল, মুদ্রার থলেটা সে রাখবে না।
রাতে সে এক মুহূর্তও চোখ বোজেনি। টেবিলের ওপর সেই নতুন রুপোর মুদ্রাগুলো মোমের আলোয় ঝিকমিক করছিল, প্রতিটা যেন একটা নীরব হাসি, যে হাসির পেছনে কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। তাহলে তো আরও ভালো। তখন সে নিজেই আমাদের হাতে তুলে দেবে। আগন্তুকের সেই কথাটা লুকাসের মাথায় ঘুরছিল। যে টাকা সে নেবে, তার প্রতিটা মুদ্রা তাকে ওদের কাছে আরও ঋণী করে দেবে।
ভোর হওয়ার আগেই সে থলেটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। উত্তরের পুরনো জেটি তখনও ঘন কুয়াশায় ঢাকা। পানির ওপর ধোঁয়ার মতো সাদা চাদর, আর খুঁটির গায়ে ঢেউয়ের ক্ষীণ ছলাৎ। লুকাস সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেখানে সেদিন সন্ধ্যায় লবঙ্গের গন্ধওয়ালা মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে ভেজা কাঠের ওপর থলেটা নামিয়ে রাখল। পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বের করে, তার ওপর কয়েকটা শব্দ লিখে থলের নিচে চাপা দিল।
"আমার বাবার জাহাজ আমি নিজের টাকায় বাঁচাব।"
সে ফিরতে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল। কুয়াশার মধ্যে কিছু নেই, শুধু জেটির খুঁটিগুলো ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। তবু তার ঘাড়ের কাছে সেই পুরনো শিরশিরে অনুভূতি, যেন কেউ তাকে দেখছে। সে জানত, থলেটা বেশিক্ষণ পড়ে থাকবে না।
বাড়ি ফিরে মাকে বলতেই তাঁর মুখে একটা ভার নেমে গেল। কিছু না বলে তিনি শুধু লুকাসের হাত চেপে ধরলেন।
কিন্তু টাকার সমস্যা তখনও আগের মতোই। আর এখন নতুন সমস্যা যোগ হলো: ক্যাপ্টেন।
লুকাস জানত, জাহাজ ছাড়ানো মানেই শেষ নয়। সে কুড়ি বছরের এক তরুণ, কোনো জাহাজ কখনও চালায়নি। আর চল্লিশ দিনের এমন যাত্রায়, অজানা পথে, একজন অভিজ্ঞ মাস্টার ছাড়া কেউ জাহাজে উঠবে না। বন্দরের আইনও তা-ই বলে। তাই সেদিন সকাল থেকেই সে শুরু করল ক্যাপ্টেনের খোঁজ।
প্রথম গেল ঘাটের সরাইখানায়, যেখানে ভোরের কুলিরা গরম স্যুপ খায়। ধোঁয়া আর মদের গন্ধে ঘরটা ভারী। কোণের টেবিলে বসে ছিলেন এক মোটা, লালমুখো মাস্টার, যাঁর জাহাজ দক্ষিণের মশলা বন্দরে যায়। লুকাস সামনে গিয়ে বসল।
"আমার একজন ক্যাপ্টেন দরকার। দীর্ঘ যাত্রা। পশ্চিমের সাগরে।"
"কার জাহাজ?"
"আমার বাবার। দিয়েগো মোরেনোর।"
লোকটার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মগটা নামিয়ে রাখল, তারপর ধীরে মাথা নাড়ল। "ওই জাহাজে আমি কেন, বন্দরের কেউই উঠবে না, ছেলে। ঝড়ের সময় ডেক থেকে একজন মানুষ হারিয়ে গেছে। ওটা অভিশপ্ত।"
"ওটা অভিশপ্ত নয়। ওটা..."
"ওলিভেরা নিজে বলেছে," লোকটা তাকে থামিয়ে দিল। "ওই জাহাজে যে ওঠে, সে আর ফেরে না। আমি বাল-বাচ্চা নিয়ে সংসার করি।"
দ্বিতীয় জন আরও রূঢ়। "পশ্চিমের সাগর? কূলহীন? তুমি কি আমাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারতে চাও?" তৃতীয় জন কথাই শুনল না, লুকাসের নাম শুনেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। চতুর্থ জন তার চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত করুণার সুরে বলল, "বাবার কথা ভুলে যাও, খোকা। এ বন্দরের সবাই জানে, কার বিরুদ্ধে যাচ্ছ।"
কার বিরুদ্ধে। লুকাসের গলা শুকিয়ে এল। এ বন্দর তাহলে সবটা জানে, শুধু মুখ বন্ধ রেখেছে। যে ভয় ওদের থামিয়ে রেখেছে, সেটাই এই শহরের আসল শাসক।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। লুকাস একের পর এক দরজায় কড়া নাড়ল, প্রতিটা উত্তরে নতুন প্রত্যাখ্যান। সরাইখানার কোণে সে দেখল ফিরে আসা সাত নাবিকের তিনজনকে, নতুন কোট গায়ে, মদের পাত্র সামনে, হাসছে। একজন তরুণ নাবিকের চোখ লুকাসের সাথে একবার মিলল। সেই ছেলেটা, যে প্রথম দিন বন্দরে তার চোখ এড়িয়ে পালিয়েছিল। এবারও সে চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, আর তার হাত মদের পাত্রে কেঁপে উঠল।
সন্ধ্যায় লুকাস ক্লান্ত পায়ে ঘাটের পাথুরে ধাপে বসে পড়ল। সূর্য ডুবছে, সমুদ্র লাল-সোনালি আলোয় ভাসছে, অথচ তার ভেতরটা অন্ধকার। একটা পুরো দিন কেটে গেছে, খালি হাতে। ঘড়ির কাঁটা তাকে তাড়া করছে। আর মাত্র দুদিন।
"এত মনমরা কেন, বাবা?"
কর্কশ, চেনা গলা। ফেলিপা পাশে এসে বসল, মাছের ঝুড়িটা পাশে নামিয়ে। লুকাস সব বলল না, শুধু বলল, কোনো ক্যাপ্টেন পাচ্ছে না।
বুড়ি কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবল। তারপর বলল, "একজন ছিল। এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো, বুঝলে। হেনরিক ভালদেজ। বিশ-বাইশ বছর আগে এমন দক্ষ মানুষ আমি আর দেখিনি। কিন্তু দশ বছর হয়ে গেল, সে আর কোনো জাহাজে ওঠে না।"
"কেন?"
"কেউ জানে না। একদিন নিজের জাহাজ বিক্রি করে দিল, উত্তরের টিলার ওপর পুরনো বাতিঘরের পাশে একটা কুঁড়ে বানিয়ে একা থাকে। কারও সাথে কথা বলে না।" ফেলিপা নিচু গলায় যোগ করল, "আর ও দিয়েগোর খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। একসময়।"
লুকাসের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। একসময়।
সে সেই রাতেই এস্তেবানের কুঁড়েঘরে গেল। বুড়ো আগুনের পাশে বসে ছিল, আর নামটা শুনতেই তার মুখের রং বদলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য, শুধু এক মুহূর্তের জন্য। তারপর সে নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু লুকাসের চোখ এড়াল না।
"ভালদেজ," এস্তেবান ধীরে বলল। "হ্যাঁ। সে ভালো ক্যাপ্টেন। সবচেয়ে ভালো।" সে লাঠির ওপর হাত চেপে ধরল। "যাও, কথা বলো। কিন্তু ছেলে, মানচিত্রের কথা একটা শব্দও মুখে এনো না। কোনো শব্দ না। যতক্ষণ না আমি বলি।"
"আপনি তাকে চেনেন?"
"সবাই তাকে চেনে," বুড়ো এড়িয়ে গেল, আর আগুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
নবম দিনের ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই, লুকাস পথ ধরল উত্তরের টিলার দিকে।
পথটা খাড়া আর পাথুরে, দুপাশে নুয়ে পড়া নোনা ঝোপ, আর নিচে অনেক নিচে সমুদ্র ঢেউ ভেঙে ভেঙে গর্জন করছে। হাওয়া এখানে তীব্র, চোখে নোনা জল এনে দেয়। ওপরে উঠতে উঠতে সে দেখতে পেল পুরনো বাতিঘরটা, অর্ধেক ভাঙা, কালো পাথরের স্তম্ভ। আর তার ছায়ার নিচে, পাথর আর ভাসা কাঠ দিয়ে বানানো একটা ছোট্ট কুঁড়ে, চালা দিয়ে ধোঁয়া উঠছে।
হাঁটতে হাঁটতে লুকাস নিজের হৃৎস্পন্দন গুনছিল। এই লোক যদি না বলে, তাহলে আর কোনো পথ নেই। আগামীকাল নিলাম, আর তার হাতে না আছে টাকা, না ক্যাপ্টেন। বাবার জাহাজ, বাবার মানচিত্র, বাবার না-বলা কথা, সবকিছু এক সুতোয় ঝুলছে, আর সেই সুতোর অন্য মাথা ধরে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে জীবনে একবারও দেখেনি।
কুঁড়ের সামনে একটা লোক বসে ছিল একটা পিপের ওপর, হাতে ছুরি, আর একটুকরো কাঠ খোদাই করছে। চওড়া কাঁধ, ধূসর-ছোপ দাড়ি, গায়ে বোতামহীন পুরনো নৌ-কোট। বাঁ ভুরুর ওপর একটা সাদা, পুরনো দাগ। হাতের তালুতে দড়ির ঘষার কালচে চিহ্ন। লুকাসকে আসতে দেখে সে মাথা তুলল না, শুধু ছুরির কাজ থামাল।
"দিয়েগোর ছেলে," লোকটা বলল, তাকিয়ে না দেখেই। তার গলা ভারী, ধীর, সমুদ্রের মতো। "তোমার চলার ভঙ্গি ওর মতো।"
লুকাস থমকে দাঁড়াল। "আপনি আমাকে চেনেন?"
এবার লোকটা মুখ তুলল। গাঢ়, গভীর চোখ, যার ভেতরে কোনো একটা ভারী, পুরনো কিছু জমে আছে। সে অনেকক্ষণ লুকাসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো পুরনো ছবির সাথে মেলাচ্ছে।
"তুমি কী চাও, ছেলে?"
"আমার একজন ক্যাপ্টেন দরকার। দীর্ঘ যাত্রার জন্য। বাবার জাহাজ নিয়ে।"
"কোথায় যেতে চাও?"
"উপকূল ধরে। মালের কাজে।"
ভালদেজ হেসে উঠল। হাসিটা ছোট, শুকনো, তাতে কোনো আনন্দ নেই। "দিয়েগোর ছেলে কখনও উপকূল ধরে যায় না। সে ঘুরপথেও যায় না।" সে ছুরিটা পিপের ওপর রাখল, দাঁড়িয়ে পড়ল। "তুমি এই পাহাড় পর্যন্ত এসেছ, কারণ সবাই তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর আমি শেষ ভরসা।"
লুকাসের মুখ গরম হয়ে উঠল। সে কিছু বলতে পারল না।
ভালদেজ কাছে এসে দাঁড়াল। খুব কাছে, এত কাছে যে লুকাস তার নিঃশ্বাসে পুরনো তামাকের গন্ধ পেল। তারপর খুব নিচু গলায় সে বলল, যেন বাতাসও শুনতে না পায়:
"আমি জানি তুমি কী খুঁজছ, ছেলে। আর আমি জানি, কে তোমাকে সিন্দুকের চাবি দিয়েছে। দিয়েগো নিজে? নাকি বুড়ো এস্তেবান?"
রাতে সে এক মুহূর্তও চোখ বোজেনি। টেবিলের ওপর সেই নতুন রুপোর মুদ্রাগুলো মোমের আলোয় ঝিকমিক করছিল, প্রতিটা যেন একটা নীরব হাসি, যে হাসির পেছনে কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। তাহলে তো আরও ভালো। তখন সে নিজেই আমাদের হাতে তুলে দেবে। আগন্তুকের সেই কথাটা লুকাসের মাথায় ঘুরছিল। যে টাকা সে নেবে, তার প্রতিটা মুদ্রা তাকে ওদের কাছে আরও ঋণী করে দেবে।
ভোর হওয়ার আগেই সে থলেটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। উত্তরের পুরনো জেটি তখনও ঘন কুয়াশায় ঢাকা। পানির ওপর ধোঁয়ার মতো সাদা চাদর, আর খুঁটির গায়ে ঢেউয়ের ক্ষীণ ছলাৎ। লুকাস সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেখানে সেদিন সন্ধ্যায় লবঙ্গের গন্ধওয়ালা মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে ভেজা কাঠের ওপর থলেটা নামিয়ে রাখল। পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বের করে, তার ওপর কয়েকটা শব্দ লিখে থলের নিচে চাপা দিল।
"আমার বাবার জাহাজ আমি নিজের টাকায় বাঁচাব।"
সে ফিরতে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল। কুয়াশার মধ্যে কিছু নেই, শুধু জেটির খুঁটিগুলো ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। তবু তার ঘাড়ের কাছে সেই পুরনো শিরশিরে অনুভূতি, যেন কেউ তাকে দেখছে। সে জানত, থলেটা বেশিক্ষণ পড়ে থাকবে না।
বাড়ি ফিরে মাকে বলতেই তাঁর মুখে একটা ভার নেমে গেল। কিছু না বলে তিনি শুধু লুকাসের হাত চেপে ধরলেন।
কিন্তু টাকার সমস্যা তখনও আগের মতোই। আর এখন নতুন সমস্যা যোগ হলো: ক্যাপ্টেন।
লুকাস জানত, জাহাজ ছাড়ানো মানেই শেষ নয়। সে কুড়ি বছরের এক তরুণ, কোনো জাহাজ কখনও চালায়নি। আর চল্লিশ দিনের এমন যাত্রায়, অজানা পথে, একজন অভিজ্ঞ মাস্টার ছাড়া কেউ জাহাজে উঠবে না। বন্দরের আইনও তা-ই বলে। তাই সেদিন সকাল থেকেই সে শুরু করল ক্যাপ্টেনের খোঁজ।
প্রথম গেল ঘাটের সরাইখানায়, যেখানে ভোরের কুলিরা গরম স্যুপ খায়। ধোঁয়া আর মদের গন্ধে ঘরটা ভারী। কোণের টেবিলে বসে ছিলেন এক মোটা, লালমুখো মাস্টার, যাঁর জাহাজ দক্ষিণের মশলা বন্দরে যায়। লুকাস সামনে গিয়ে বসল।
"আমার একজন ক্যাপ্টেন দরকার। দীর্ঘ যাত্রা। পশ্চিমের সাগরে।"
"কার জাহাজ?"
"আমার বাবার। দিয়েগো মোরেনোর।"
লোকটার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে মগটা নামিয়ে রাখল, তারপর ধীরে মাথা নাড়ল। "ওই জাহাজে আমি কেন, বন্দরের কেউই উঠবে না, ছেলে। ঝড়ের সময় ডেক থেকে একজন মানুষ হারিয়ে গেছে। ওটা অভিশপ্ত।"
"ওটা অভিশপ্ত নয়। ওটা..."
"ওলিভেরা নিজে বলেছে," লোকটা তাকে থামিয়ে দিল। "ওই জাহাজে যে ওঠে, সে আর ফেরে না। আমি বাল-বাচ্চা নিয়ে সংসার করি।"
দ্বিতীয় জন আরও রূঢ়। "পশ্চিমের সাগর? কূলহীন? তুমি কি আমাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারতে চাও?" তৃতীয় জন কথাই শুনল না, লুকাসের নাম শুনেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। চতুর্থ জন তার চোখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত করুণার সুরে বলল, "বাবার কথা ভুলে যাও, খোকা। এ বন্দরের সবাই জানে, কার বিরুদ্ধে যাচ্ছ।"
কার বিরুদ্ধে। লুকাসের গলা শুকিয়ে এল। এ বন্দর তাহলে সবটা জানে, শুধু মুখ বন্ধ রেখেছে। যে ভয় ওদের থামিয়ে রেখেছে, সেটাই এই শহরের আসল শাসক।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। লুকাস একের পর এক দরজায় কড়া নাড়ল, প্রতিটা উত্তরে নতুন প্রত্যাখ্যান। সরাইখানার কোণে সে দেখল ফিরে আসা সাত নাবিকের তিনজনকে, নতুন কোট গায়ে, মদের পাত্র সামনে, হাসছে। একজন তরুণ নাবিকের চোখ লুকাসের সাথে একবার মিলল। সেই ছেলেটা, যে প্রথম দিন বন্দরে তার চোখ এড়িয়ে পালিয়েছিল। এবারও সে চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, আর তার হাত মদের পাত্রে কেঁপে উঠল।
সন্ধ্যায় লুকাস ক্লান্ত পায়ে ঘাটের পাথুরে ধাপে বসে পড়ল। সূর্য ডুবছে, সমুদ্র লাল-সোনালি আলোয় ভাসছে, অথচ তার ভেতরটা অন্ধকার। একটা পুরো দিন কেটে গেছে, খালি হাতে। ঘড়ির কাঁটা তাকে তাড়া করছে। আর মাত্র দুদিন।
"এত মনমরা কেন, বাবা?"
কর্কশ, চেনা গলা। ফেলিপা পাশে এসে বসল, মাছের ঝুড়িটা পাশে নামিয়ে। লুকাস সব বলল না, শুধু বলল, কোনো ক্যাপ্টেন পাচ্ছে না।
বুড়ি কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবল। তারপর বলল, "একজন ছিল। এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো, বুঝলে। হেনরিক ভালদেজ। বিশ-বাইশ বছর আগে এমন দক্ষ মানুষ আমি আর দেখিনি। কিন্তু দশ বছর হয়ে গেল, সে আর কোনো জাহাজে ওঠে না।"
"কেন?"
"কেউ জানে না। একদিন নিজের জাহাজ বিক্রি করে দিল, উত্তরের টিলার ওপর পুরনো বাতিঘরের পাশে একটা কুঁড়ে বানিয়ে একা থাকে। কারও সাথে কথা বলে না।" ফেলিপা নিচু গলায় যোগ করল, "আর ও দিয়েগোর খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। একসময়।"
লুকাসের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। একসময়।
সে সেই রাতেই এস্তেবানের কুঁড়েঘরে গেল। বুড়ো আগুনের পাশে বসে ছিল, আর নামটা শুনতেই তার মুখের রং বদলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য, শুধু এক মুহূর্তের জন্য। তারপর সে নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু লুকাসের চোখ এড়াল না।
"ভালদেজ," এস্তেবান ধীরে বলল। "হ্যাঁ। সে ভালো ক্যাপ্টেন। সবচেয়ে ভালো।" সে লাঠির ওপর হাত চেপে ধরল। "যাও, কথা বলো। কিন্তু ছেলে, মানচিত্রের কথা একটা শব্দও মুখে এনো না। কোনো শব্দ না। যতক্ষণ না আমি বলি।"
"আপনি তাকে চেনেন?"
"সবাই তাকে চেনে," বুড়ো এড়িয়ে গেল, আর আগুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
নবম দিনের ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই, লুকাস পথ ধরল উত্তরের টিলার দিকে।
পথটা খাড়া আর পাথুরে, দুপাশে নুয়ে পড়া নোনা ঝোপ, আর নিচে অনেক নিচে সমুদ্র ঢেউ ভেঙে ভেঙে গর্জন করছে। হাওয়া এখানে তীব্র, চোখে নোনা জল এনে দেয়। ওপরে উঠতে উঠতে সে দেখতে পেল পুরনো বাতিঘরটা, অর্ধেক ভাঙা, কালো পাথরের স্তম্ভ। আর তার ছায়ার নিচে, পাথর আর ভাসা কাঠ দিয়ে বানানো একটা ছোট্ট কুঁড়ে, চালা দিয়ে ধোঁয়া উঠছে।
হাঁটতে হাঁটতে লুকাস নিজের হৃৎস্পন্দন গুনছিল। এই লোক যদি না বলে, তাহলে আর কোনো পথ নেই। আগামীকাল নিলাম, আর তার হাতে না আছে টাকা, না ক্যাপ্টেন। বাবার জাহাজ, বাবার মানচিত্র, বাবার না-বলা কথা, সবকিছু এক সুতোয় ঝুলছে, আর সেই সুতোর অন্য মাথা ধরে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে জীবনে একবারও দেখেনি।
কুঁড়ের সামনে একটা লোক বসে ছিল একটা পিপের ওপর, হাতে ছুরি, আর একটুকরো কাঠ খোদাই করছে। চওড়া কাঁধ, ধূসর-ছোপ দাড়ি, গায়ে বোতামহীন পুরনো নৌ-কোট। বাঁ ভুরুর ওপর একটা সাদা, পুরনো দাগ। হাতের তালুতে দড়ির ঘষার কালচে চিহ্ন। লুকাসকে আসতে দেখে সে মাথা তুলল না, শুধু ছুরির কাজ থামাল।
"দিয়েগোর ছেলে," লোকটা বলল, তাকিয়ে না দেখেই। তার গলা ভারী, ধীর, সমুদ্রের মতো। "তোমার চলার ভঙ্গি ওর মতো।"
লুকাস থমকে দাঁড়াল। "আপনি আমাকে চেনেন?"
এবার লোকটা মুখ তুলল। গাঢ়, গভীর চোখ, যার ভেতরে কোনো একটা ভারী, পুরনো কিছু জমে আছে। সে অনেকক্ষণ লুকাসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো পুরনো ছবির সাথে মেলাচ্ছে।
"তুমি কী চাও, ছেলে?"
"আমার একজন ক্যাপ্টেন দরকার। দীর্ঘ যাত্রার জন্য। বাবার জাহাজ নিয়ে।"
"কোথায় যেতে চাও?"
"উপকূল ধরে। মালের কাজে।"
ভালদেজ হেসে উঠল। হাসিটা ছোট, শুকনো, তাতে কোনো আনন্দ নেই। "দিয়েগোর ছেলে কখনও উপকূল ধরে যায় না। সে ঘুরপথেও যায় না।" সে ছুরিটা পিপের ওপর রাখল, দাঁড়িয়ে পড়ল। "তুমি এই পাহাড় পর্যন্ত এসেছ, কারণ সবাই তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর আমি শেষ ভরসা।"
লুকাসের মুখ গরম হয়ে উঠল। সে কিছু বলতে পারল না।
ভালদেজ কাছে এসে দাঁড়াল। খুব কাছে, এত কাছে যে লুকাস তার নিঃশ্বাসে পুরনো তামাকের গন্ধ পেল। তারপর খুব নিচু গলায় সে বলল, যেন বাতাসও শুনতে না পায়:
"আমি জানি তুমি কী খুঁজছ, ছেলে। আর আমি জানি, কে তোমাকে সিন্দুকের চাবি দিয়েছে। দিয়েগো নিজে? নাকি বুড়ো এস্তেবান?"
